রেজিস্ট্রার ছাড়াই চলছে কুবি প্রশাসন: স্থবির প্রশাসনিক কার্যক্রম 

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈনের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কথা জানিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রারের পদত্যাগের পাঁচ মাস পার হলেও নতুন রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে স্থবিরতা বিরাজ করছে প্রশাসনিক কার্যক্রমে। তবে স্থবিরতার বিষয়টি মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করেন উপাচার্য। 

জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেজিস্ট্রার মো. মুজিবুর রহমান মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু তাহেরকে রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পদে নিয়োগ দেয় প্রশাসন। চার বছর দায়িত্ব পালন শেষে উপাচার্যের সাথে কাজ করতে গিয়ে সমন্বয়হীনতা ও অস্বস্তিবোধ জানিয়ে গত ২৩ মার্চ পদত্যাগ করেন ড. তাহের। এতে গত পাঁচ মাস যাবৎ রেজিস্ট্রার বিহীন রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।   

শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, তিনজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার দিয়ে কোনরকমে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কর্মকর্তাদের একাংশ বলছেন, জুনিয়র এক ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে সুযোগ দিতে চায় উপাচার্য। তবে শিক্ষকরা বলছেন, রেজিস্ট্রার যেহেতু শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বেশি কানেক্টেড সেক্ষেত্রে শিক্ষক থেকেই রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া উচিত। এর আগে ২০০৭ সালে স্থায়ী রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পায় মুজিবুর রহমান মজুমদার। ২০১৮ সালে তাকে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা পদসহ লাইব্রেরিতে বদলি করা হয়। বিষয়টি তার প্রতি অবিচার হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।  

বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬ এর ১৩ নং ধারায় বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক কর্মকর্তা হইবেন এবং সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সচিবের দায়িত্ব পালন করিবেন (১৩-ক)। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পূর্ণকালীন নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও ইউজিসির নির্দেশনার কোনটিই মানছে না কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এদিকে শিক্ষক নেতারা বলছেন, শিক্ষকদের বিভিন্ন আবেদন করতে হয় রেজিস্ট্রার বরাবর। কিন্তু তিনজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার থাকায় কার কাছে কোন আবেদন করবে সেটি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় তারা একজন আরেকজনের দায়িত্ব বলে চালিয়ে দেয়। তারা আরো অভিযোগ করেন, উপাচার্য নিজের পছন্দের লোককে রেজিস্ট্রার পদে বসাতে চায়। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য কাউকে বসালে সেটির বিরূপ প্রভাব পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, রেজিস্ট্রারের মত গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অনেকদিন ধরে শূন্য থাকায় কাজের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কোন একটি ফাইল বা চিঠি তুলতে হলে রেজিস্ট্রার দপ্তর হয়ে যেতে হয়। অথচ সেখানে ৫-৬ মাস ধরে দপ্তরটি বন্ধ। 

সাবেক রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. আবু তাহের বলেন, রেজিস্ট্রার হল প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও উল্লেখ আছে সব চিঠিপত্র আদান-প্রদান হবে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে। ইউজিসি, মন্ত্রণালয়ের সাথে মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে রেজিস্ট্রার। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা যেকোন আবেদন তার কাছে করবেন। এখন রেজিস্ট্রার না থাকার কারণে তারা বিভ্রান্তিতে পড়ছে কার কাছে আবেদন করবে এবং ফিড ব্যাকটাও পাচ্ছে না। কিন্তু রেজিস্ট্রার না থাকলে প্রশাসন স্থবির হয়ে যায়। একদিনও রেজিস্ট্রার বিহীন বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। 

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, 'আমাদের আহ্বান ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ দেওয়া। আগে আমরা একটি প্রজ্ঞাপন দিয়েছি সেটির আবার রিমাইন্ডার দিব। আর একটি কনট্রাক্টচুয়াল নীতিমালা তৈরি করছি। কমিশনে পাশ হলে এক মাসের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্থায়ী রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিতে হবে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্থায়ী নিয়োগ দিতে বলেছি।' 

এ বিষয়ে উপাচার্য ড. মঈন বলেন, 'কোথাও কোন স্থবিরতা নাই, কেউ যদি বলে থাকে তাহলে সেটা মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বরং রেজিস্ট্রার থাকার সময় আমরা দেখেছি যে দলাদলি, অমুক তমুক, এটি এখন নাই। এখন ফেয়ার জাজমেন্ট হচ্ছে। শিক্ষকেরা এসে আমাকে বলে আগে ইচ্ছামত ফাইল আটকে রাখতো। তার দলের লোকদের সুবিধা দিত, জিনিসটা এখন নাই। এখন আগের চেয়ে আরও দ্রুত কাজ হচ্ছে। ডেপুটি তিন জনেই ভাল কাজ করছে। এখন আমার কাজ আরও তাড়াতাড়ি হয়।' 

ইউজিসির নীতিমালার বিষয়ে তিনি বলেন, 'ইউজিসি থেকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমরা বলেছি শীঘ্রই নিয়োগের বিষয়টি জানিয়ে দিব। রেজিস্ট্রার সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সচিব এটি বিষয় না। যে কেউ মিটিং ডাকতে পারে, ডেপুটি রেজিস্ট্রারও ডাকতে পারে। দেখতে হবে কাজটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা। আমাদের সব কাজ চলছে।'