ভুল গ্রুপের রক্ত পুশে প্রসূতির মৃত্যু!

ভুল গ্রুপের রক্ত পুশ করায় গাজীপুরের কালীগঞ্জের একটি ক্লিনিকে শিরিন বেগম (৩২) নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকের খামখেয়ালিপনায় ভয়াবহ এই ঘটনা ঘটেছে উপজেলার জনসেবা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। রক্তশূন্য হয়ে পড়া প্রসূতির ‘এ’ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন থাকলেও তাকে পুশ করা হয় ‘বি’ পজিটিভ রক্ত। ভুল গ্রুপের রক্ত পুশ করায় রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হলেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় প্রসূতিকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে বাধ্য করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার পর থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন হাসপাতালের মালিক, পরিচালক ও চিকিৎসকরা। বন্ধ রয়েছে তাদের মোবাইল ফোনও। রবিবার রাতের এই ঘটনাটি পুরো উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। তবে বেঁচে রয়েছে বাচ্চাটি।

আশঙ্কার কথা, দীর্ঘদিন ধরেই জনসেবা জেনারেল হাসপাতালটির লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা। বন্যা বেগম নামের এক নারী একসময় রোগীর সিরিয়াল নেওয়ার কাজ করলেও তিনি এখন হাসপাতালটির পরিচালক বনে গেছেন। বন্যা বেগমই তার ক্লিনিকে শিরিন বেগমকে ভর্তি করাতে বাধ্য করেন। কোনো স্থায়ী চিকিৎসক না থাকলেও এটিকে নাম দেওয়া হয়েছে জনসেবা জেনারেল হাসপাতাল। রোগী এলে ফোন করে এখানে ডেকে আনা হয় চিকিৎসক। রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মতো সক্ষমতা নেই ক্লিনিকটির, অথচ নামকরণ করা হয়েছে জনসেবা জেনারেল হাসপাতাল। নিহত প্রসূতি শিরিন বেগম উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চুয়ারিয়াখোলা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী। গতকাল দুপুরে জনসেবা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। খোলা রয়েছে মাত্র একটি ওষুধের ফার্মেসি। তবে এ ঘটনায় ঐ ফার্মেসির কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। পরে জনসেবা হাসপাতালের ব্যবস্থাপক জহির উদ্দিন মোবাইল ফোনে বলেন, রোগীর খারাপ অবস্থা থাকায় তাকে রবিবার রাতে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে ঐ রোগী মারা গেছে কি না তার জানা নেই বলে তিনি মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

রোগীর সঙ্গে থাকা নিহতের স্বামীর বড় বোন হোসনে আরা বলেন, “রবিবার সকালে আমার ছোট ভাইয়ের বউ হঠাৎ ব্যাথা অনুভব করে। এ সময় একই এলাকার বাসিন্দা ঐ জনসেবা হাসপাতালের পরিচালক বন্যা বেগমের কাছে যাই পরামর্শের জন্য। পরে বন্যা বলেন, ‘কোনো চিন্তা করার দরকার নাই, আমি আমার হাসপাতাল থেকে দুই জন নার্স পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ এই বলে জনসেবা হাসপাতাল থেকে সঙ্গিনী ও পান্না নামে দুই জন নার্সকে পাঠানো হয় রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য। পরে সেখানে রোগী নিয়ে গেলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সিজার করেন ঐ হাসপাতালের ডাক্তার মাসুদ। এ সময় প্রসূতি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় নিয়ে অপরেশন করার পর ডাক্তার জানায়, রোগীর জরায়ু ফেটে গেছে। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে, ‘বি’ পজিটিভ রক্ত দরকার। তাদের কথামতো ‘বি’ পজিটিভ রক্ত জোগাড় করে রোগীকে দুই ব্যাগ রক্ত পুশ করা হয়। কিন্তু তাতেও রোগী সুস্থ হচ্ছিল না। শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। পরে যখন আবারও রোগীর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হয়, তখন জানা যায়, রোগীর রক্তের গ্রুপ ‘এ’ পজিটিভ। এর মধ্যে আমাদের ‘এ’ পজিটিভ রক্ত জোগাড় করতে বলে। এখন আবার ‘এ’ পজিটিভ রক্ত কেন? এ প্রশ্ন করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে কোনো সমস্যা নাই। পরে আমরা তড়িঘড়ি করে ‘এ’ পজিটিভ রক্ত সংগ্রহ করি। কিন্তু এ পজিটিভ রক্ত পুশ করার কিছুক্ষণ পরেই রোগীর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখে রাত ৮টার দিকে রোগীর অবস্থা খারাপ বলে তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেয়। পরে রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় রওনা দিই। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দুই ব্যাগ ‘এ’ পজিটিভ রক্তের ব্যাগ রোগীর সঙ্গে দিয়ে দেয়। ঢাকা নেওয়ার পথে রোগীর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে উত্তরার একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে, সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, রোগীকে মৃত অবস্থায় এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।”

তিনি আরো জানান, ১০ বছর আগে রোগীর একটি সিজার হয়। ঐ সিজারে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ করেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সবাই লাশ দাফনে ব্যস্ত। নিহতের স্বামী রাজ্জাক অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখনো অভিযোগের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে ভাই একটু সুস্থ বা স্বাভাবিক হলে অভিযোগ করব।’ মরদেহ সোমবার বেলা ১১টায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনসেবা হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, এর আগেও এই হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একাধিক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এখানে সার্বক্ষণিক কোনো চিকিৎসক থাকেন না। প্রয়োজন হলে ফোনে ডেকে এনে সিজার করানো হয়।

তিনি আরো বলেন, জনসেবা হাসপাতালের পরিচালক বন্যা বেগম একসময় এই হাসতাপালের মূল মালিক ডা. আসাদুজ্জামান আসাদের রোগী দেখার সিরিয়াল দিতেন। এখন তিনি জনসেবা হাসপাতালের পরিচালক! কাজেই এখানে কী ধরনের চিকিৎসাসেবা পাবে মানুষ, সেটা খুব সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু তার পরও এখানে রোগী আসেন এবং এ রকম ভুল চিকিৎসার শিকার হন।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, ‘জনসেবা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজপত্র আপডেট নেই। তাদের পুরোনো সব কাগজপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ। তার পরও তারা কীভাবে চিকিৎসাসেবা দেয়? ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা আমি শুনেছি। এ ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কাগজপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর আপনারা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ঐ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে অতি দ্রুত মেয়াদোত্তীর্ণ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের ব্যবস্থা করব।’

কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন, এ ব্যপারে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসসাদিকজামান বলেন, ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনাটি দুঃখজনক। তবে এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।