ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন ও বাস্তবতা 

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামক স্বপ্নের শুরু ২০০৮ সালে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহার ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করে। ইশতেহারে ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত করার অঙ্গীকার করা হয়। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে অনেকে উপহাস করেছিল, এটিকে ‘দিবাস্বপ্ন’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। তারা যে ভুল ছিল, তা ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে বাংলাদেশ আজ বিপ্লব সাধন করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারে সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণার আলোকে ইতিমধ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে, প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রত্যেকের হাতে এখন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, দুনিয়ার সব প্রান্তের খবর মুহূর্তেই এসে যাচ্ছে হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশ সরকারের সেবামূলক সব ফরম পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরির আবেদন, পড়াশোনা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ফোন বিলসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধ, মোবাইল মানি ট্রান্সফার, ব্যাংকিং, পাসপোর্ট আবেদন, ভিসা প্রসেসিং, বিমানের টিকিট, রেলওয়ে টিকিটিং, ইটেন্ডারিং, টিন সনদ, আয়কর রিটার্ন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন, জিডি, জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য করা যাচ্ছে অনলাইনে, অর্থাৎ ডিজিটাল পদ্ধতিতে।

জাতীয় ওয়েব পোর্টাল, জাতীয় ই-তথ্যকোষ, জাতীয় ডেটা সেন্টার, জেলা ওয়েব পোর্টাল, জেলা ই-সেবাকেন্দ্র, উপজেলা ওয়েব পোর্টাল, ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র, ক্লাসরুমে মালটিমিডিয়া প্রজেক্টরের ব্যবহার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব পাঠ্যপুস্তক নিয়ে ই-বুক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াই-ফাই চালু, অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্প, ফোরজি প্রযুক্তি, ই-ফাইলিং, মোবাইল ব্যাংকিং, মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্যসেবা, কম্পিউটারভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনা, মন্ত্রণালয়ে ই-সেবা, হাইটেক পার্ক, ইপিআই ও আইটিইই সার্টিফিকেশন, ডট বাংলা ডোমেইন, ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার অপটিক, জাতীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী পুরস্কার প্রবর্তন, বিনিয়োগের জন্য অনলাইন নিবন্ধন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা, অনলাইনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার তথ্য, কৃষিতথ্য সার্ভিস, ইলেকট্রনিক দরপত্র পদ্ধতি, ডিজিটাল স্বাক্ষর পদ্ধতির প্রবর্তনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রসারে বিপ্লব সূচিত হয়েছে। শুধু বিভাগীয় বা জেলা শহরে নয়, উপজেলা সদর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে এমনকি দুর্গম অঞ্চলেও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছে দিয়েছে বর্তমান সরকার। ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলায় ৫ হাজারেরও বেশি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জনগণকে সেবা দেওয়া হয়। হেল্পলাইনের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে জরুরি সেবা পৌঁছে যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশের সেবা পাচ্ছে জনগণ, যা ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুধাবন করেছিলেন, বাংলাদেশকে যদি উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে হয়, আমাদের কার্যকর মিশন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সোনার বাংলা বাস্তবায়নে তিনি নানা স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদের দৃষ্টান্ত তার সামনে ছিল। একটি দেশকে সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ড. মাহাথির।

মাত্র ৭৩৩ কিলোমিটার একটি দেশ সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের একটি জেলার চেয়েও আয়তনে ছোট। এটি একসময় ছিল মালয়েশিয়ার জহুরবারু প্রদেশের অংশবিশেষ। সেখানে জেলেপল্লি ছিল। একজন যোগ্য নেতার নেতৃত্বে সেই সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম একটি আধুনিক সম্পদশালী দেশে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অবস্থা শোচনীয় হয়েছিল, সেই জাপান পরিশ্রমের মাধ্যমে, সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি দেশে পরিণত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া কীভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে গেছে—এসব উদাহারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে ছিল। তাই তিনি একের পর এক রূপকল্প ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন-২০২১, ভিশন-২০৪১, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল-২০৩০, ১০০ বছরের ডেলটা প্ল্যান এবং সর্বোপরি ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা ঘোষণা করেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই দেশকে যদি এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, এ দেশের মানুষকে আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত হতে হবে এবং তাদের প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। এই ধারণা থেকেই তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র, জননেত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। সজীব ওয়াজেদ জয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অবৈতনিক আইসিটিবিষয়ক উপদেষ্টা। ২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি কোনো সেবাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সব দপ্তরের প্রাথমিক সব তথ্য ও সেবা মিলছে ওয়েবসাইটে। সেই সঙ্গে সরকারি সব তথ্য যাচাই-বাছাই ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পরিষেবা ও আবেদনের যাবতীয় কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে প্রত্যেক গ্রাহকের হাতের মুঠোয়। ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ এখন ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ফ্রিল্যান্সিং থেকে আসা এই অর্থ আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এক আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ‘রূপকল্প ২০২১’ আজ বাস্তবিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকে ১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উত্ক্ষেপণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এটি ছিল একটি অনন্য পদক্ষেপ। ২০১৮ সালের ১২ মে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইট বিশ্বের অভিজাত ক্লাবে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৫৭তম দেশ, যাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের জানালা খুলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এই ডিজিটাল প্রযুক্তি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ব্যবহার শুরু করার বিষয়ে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের দুটি মূল কথা ছিল—একটি ছিল ক্যাশলেস সোসাইটি আর দ্বিতীয়টি ছিল পেপারলেস সোসাইটি। নগদ অর্থের লেনদেন করে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে না। আমাদের দেশও ধীরে ধীরে ক্যাশলেস সোসাইটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সরকারি অফিস-আদালতের একটি অংশ ২০২২ সালের মধ্যে পেপারলেস অফিসে পরিণত করা। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সিটি স্থানান্তর সম্ভব হয়নি। কিন্তু অনেক সরকারি অফিস অনেকটাই এগিয়ে গেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৯০ শতাংশ নথির কাজ এখন ই-নথিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। আমরা পেপারলেস সোসাইটি গঠনে সরকারের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছি।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপই হচ্ছে আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মা-বাবা-ভাইসহ তার পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছেন। ছোট বোন শেখ রেহানা ও তিনি বিদেশ ছিলেন বিধায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। অন্যথায় বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত। আমাদের সৌভাগ্য যে, এই জাতির কাণ্ডারি হয়ে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরে এসেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী যতই দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করুক, আমরা যদি আমাদের অবস্থান থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা না করি, তার পরিশ্রম সার্থক হবে না। আমরা যদি আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করি, দেশ এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধ, সোনার বাংলা করতে হলে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের মত-পথের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু কিছু মৌলিক প্রশ্নে আমাদের এক হতে হবে। আমাদের দেশ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ—এসব প্রশ্নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এসব প্রশ্নে আমরা যদি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারি, এই জাতি বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না। সুতরাং আসুন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে আমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব আমরা যার যার অবস্থান থেকে পালন করি। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আমরা ইতিমধ্যে পেতে শুরু করেছি। এই হোক আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ আগামী দিনে উন্নত বিশ্বের কাতারে এগিয়ে যাবে, বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লেখক : সচিব, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন; সদস্য, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল