চট্টগ্রামে বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে নানা অনিয়ম

চট্টগ্রামে বেসরকারিভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ১৬টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এসব নিরাময় কেন্দ্রে চিকিত্সা নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে সরকারি শর্তের অধিকাংশই মানা হচ্ছে না। নেই সার্বক্ষণিক চিকিত্সক ও নার্স। কেন্দ্রগুলো তদারকিতে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেরও গাফিলতির অভিযোগ রয়েছে।

সরকারিভাবে শর্ত রয়েছে এসব নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক রোগী ভর্তি করা যাবে না। শুধু মাদকাসক্ত রোগী ভর্তি করতে পারবেন। কিন্তু এই নিয়ম না মেনে টাকার লোভে মানসিক রোগী ভর্তির অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি সবগুলো নিরাময় কেন্দ্র আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিচালিত হচ্ছে। অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রের পরিবেশও ভালো নয়। চিকিত্সা ও কাউন্সিলিংয়ের নামে রোগীদের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও পাওয়া যায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সার ক্ষেত্রে সরকারিভাবে কোনো ফি নির্ধারিত নেই। ফলে চিকিত্সা বাবদ রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়। এতে অসহায় পরিবারগুলোও চিকিত্সার জন্য কেন্দ্রগুলোর চাহিদা অনুপাতে টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো সরকারি আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। একটি প্রতিষ্ঠান বছরের সর্বনিম্ন দেড় লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি আর্থিক অনুদান পেয়ে থাকে। চট্টগ্রামে বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা সরকারি অনুদান পেয়ে থাকে। তবে সরকারি অনুদান পেতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি শর্ত মেনে চলছে কি না তা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকারিভাবে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয়। তাই বেসরকারি এসব নিরাময় কেন্দ্রের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিত্সক নার্সদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য সরকার অনুদান দিয়ে থাকেন। মাদকাসক্ত রোগীরা যাতে সুচিকিত্সা পেতে পারেন এটাই সরকারের অনুদানের উদ্দেশ্য। কিন্তু সরকারের এই টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর হালিশহর আবাসিক এলাকায় অঙ্কুর মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নামে একটি ২০ শঘ্যার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই কেন্দ্রে বর্তমানে ১৫ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিত্সাধীন রয়েছে। তারা ইয়াবা ও গাঁজায় আসক্ত। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মঞ্জুর হোসেন পিন্টু বলেন, ‘মাদকাসক্ত ব্যক্তির সুস্হতার জন্য মূলত কাউন্সিলিং গুরুত্বপূর্ণ। এখানে চিকিত্সার প্রক্রিয়াটা হলো তিন থেকে পাঁচ/ছয় মাসের কাউন্সিলিং। ওষুধ প্রয়োগ করে চিকিত্সা প্রদান আবশ্যক নয়। তার পরও কোনো কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তির হার্ট, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি সমস্যাসহ অন্যান্য রোগ থাকতে পারে। তাই আমরা প্রয়োজনীয়তা অনুসারে মেডিক্যাল অফিসার রেখে থাকি।’

চমেক হাসপাতালের মানসিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবদুল মোত্তালিব বলেন, বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলো মেডিক্যাল গাইড লাইন অনুযায়ী চলছে না। ফলে মাদকাসক্ত রোগীরা সঠিক চিকিত্সা পাচ্ছে না।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোর উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা ইত্তেফাককে বলেন, মাদক সহজলভ্য হওয়ায় আসক্তের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। চট্টগ্রামে আমাদের ২৫ শঘ্যার একটি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিত্সার জন্য আসছে তাতে কমপক্ষে ১০০ শঘ্যার একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাময় কেন্দ্রের প্রয়োজন। সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের স্বল্পতার কারণে চট্টগ্রামে বেসরকারি প্রায় ১৬টি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।