রপ্তানি বৃদ্ধি ও টাকার মান

যে কোনো দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি আয় একটা বড় ভূমিকা রাখে। রপ্তানির ফলে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে এবং কর্মসংস্হানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর প্রতিটা উন্নত দেশই রপ্তানিপ্রধান। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও হাজার বছর আগে থেকেই এদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পণ্য রপ্তানি হতো। বিশেষ করে বাংলার সুলতানি আমলে আরব, চীন, মালাক্কা, সুমাত্রাসহ অনেক দেশে বাংলার পণ্য যেত। খৃষ্টপূর্ব উয়ারী-বটেশ্বর সভ্যতার সময় থেকে মসলিন ছিল বাংলার প্রধান রপ্তানি দ্রব্য যা ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের পাট, চা চিংড়ি ছিল প্রধান রপ্তানি পণ্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রপ্তানি পণ্যের তালিকা বড় হয়েছে। তৈরি পোশাক, চা ও চামড়া ছাড়াও সিল্ক ও মসলিনের শাড়ি, জুতা, চা, পাট পাতার চা, বৈদু্যতিক সামগ্রী, ওষুধ, মেলামাইন, হালকা প্রকৌশল পণ্য, বিবিধ মসলা, আচার, শুকনো খাবার, মুক্তা, নকশিকাঁথা এমনকি মাথার চুল পর্যন্ত রপ্তানি হচ্ছে। এসব ছাড়া আরো অনেক পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। বাংলাদেশের পণ্য প্রধানত ইউরোপ এবং আমেরিকার বাজারে বিক্রি হলেও আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশে আলুর ফলন বেশি হলে কৃষক এর উপযুক্ত দাম পায় না। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশের প্রধান খাবার আলু হওয়াতে সেখানে এটা রপ্তানি করা যায়। চামড়াজাত পণ্যসহ আরো অনেক পণ্য ইউরোপে রপ্তানির সুযোগ আছে।

রপ্তানির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রপ্তানিকারক তৈরি করা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কেউ রপ্তানিকারক হতে পারে না। বাংলাদেশে রপ্তানি প্রশিক্ষণ প্রদানের কোনো উদ্যোগ নেই। সাধারণত রপ্তানিকারকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকেই এটা শেখেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো নামে একটা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো প্রশিক্ষণের আয়োজন করে না। ২০১৭ সালে এখানে নাম তালিকাভুক্ত করার পরও ‘তহবিল নাই’ অজুহাতে আজ পর্যন্ত আগ্রহীরা সেখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাননি। অথচ তাদের নিজেদের মিলনায়তন এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তা থাকার পরও প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তহবিল কেন প্রয়োজন, সেটা বোধগম্য না।

রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোও প্রতিবছর অন্তত দুবার বাংলাদেশি পণ্যের মেলার আয়োজন করতে পারে, যেটা দেশের পণ্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আফ্রিকার নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশে এধরনের মেলা করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। এছাড়া বিদেশে অবস্হিত বিভিন্ন বাণিজ্যমেলায় এদেশের অংশগ্রহণকারীদের কম বিমানভাড়ায় যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ আমদানি প্রধান দেশ এবং রপ্তানির চেয়ে আমদানির পরিমাণ অনেকগুণ বেশি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বিদু্যত্ ও বৈদু্যতিক সামগ্রী এবং হালকা ও ভারী শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমদানিনির্ভরতা কমানোর জন্য পরিকল্পিভাবে উদ্যোগ নিয়ে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এসব শিল্পের অন্তত ৬০ শতাংশ কাঁচামাল দেশে উত্পাদনের উদ্যোগ নিলে এতে ব্যাপক কর্মসংস্হানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

এছাড়া রপ্তানি আয় বৃদ্ধির জন্য কোনোভাবেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমানো উচিত হবে না। কারণ বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ হাজার ৬৮ কোটি ১০ লাখ (৬০.৬৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩ হাজার ৭৮৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের। এ হিসাবেই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮০ কোটি (প্রায় ২৩ বিলিয়ন) ডলার। একজন প্রবাসীর পরিবার বা রপ্তানিকারক ডলারে ৭০ টাকা পেলেও তার কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু কৃত্রিমভাবে টাকার মান কমানো হলে দেশে আমদানিকৃত সব পণ্যের দামই বেড়ে যায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক বৃদ্ধি পায়। রপ্তানিকারক এবং শিল্প-মালিকদেরও বেশি দামে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয় এবং পণ্য রপ্তানির জন্য অতিরিক্ত পরিবহন খরচ হয়। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে উত্সাহিত করার অজুহাতে বাংলাদেশে কৃত্রিমভাবে টাকার অব্যমূল্যায়ন ঘটানো হচ্ছে। ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে হয়েছে ১০০ টাকারও বেশি। তাই টাকার মূল্য কমানো লাভজনক বলা হলেও এর ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতির ফলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইত্তেফাকের প্রতিবদেন অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রতিবছর শুধু ভারত থেকেই ১৪০০ কোটি এবং চীন থেকে প্রায় ১১০০ কোাটি টাকার পণ্য আমদানি করে। এছাড়া প্রতিবছর ভ্রমণ, চিকিত্সা এবং পড়াশোনার জন্য বিদেশে গিয়েও বাংলাদেশের নাগরিকরা আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করেন। ডলারের বিপরীতে টাকার মান মাত্র ১ টাকা কম হলেও বছরে হাজার কোটি টাকা বেঁচে যাবে এবং জনগণও কম মূল্যে আমদানিকৃত পণ্য কিনতে পারবে। সুতরাং টাকার মান কমিয়ে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।