আকমলের বাসা থেকে বেরিয়ে কলমি যখন গলিতে পা রাখে, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে চারপাশে। এতক্ষণ বৃষ্টিটা বন্ধ ছিল। কিন্তু আবার গর্জন করে আকাশে মেঘ ডাকছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে ঝুমবৃষ্টি শুরু হবে। দ্রুত পা চালায় কলমি। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে কিংবা আসতে আশেপাশের লোকজন বারবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখছে— খেয়াল করে সে। কী ব্যাপার! তার মধ্যে কী এমন ঘটেছে? সবাই এভাবে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে কেন তার দিকে?
হঠাৎ কলমি খেয়াল করে, তার শরীরে অচেনা এক সুগন্ধ জড়িয়ে আছে। আকমল তার ঘরে থাকা বিদেশি সেন্টের বোতল থেকে স্পে্র করেছিল কলমির শরীরের ঘামের গন্ধ তাড়াতে। সেই সেন্টের গন্ধটা ছড়াচ্ছে এখনো। এই গন্ধটা কতক্ষণ থাকবে কে জানে। তার মতো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করা অতি সাধারণ একটি মেয়ের শরীর থেকে এমন বিদেশি দামি পারফিউমের গন্ধ আসা অস্বাভাবিক ঠেকছে পথচারীদের কারো কারো কাছে।
সাধারণত ধনাঢ্য উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষই এমন দামি বিদেশি পারফিউম গায়ে মেখে ঘুরে বেড়ায়। একজন গার্মেন্টস কন্যার তো তেমন সুগন্ধী মাখার সুযোগ নেই। রাস্তার লোকজনদের মতো তার স্বামী দুলালও নিশ্চয়ই নাক কুঁচকে, ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাবে তার দিকে। শরীরে অচেনা সৌরভ নিয়ে ঘরে ফিরলে সেও নিশ্চয়ই জানতে চাইবে এ ব্যাপারে। কলমির শরীর থেকে তেমন বিদেশি সেন্টের গন্ধ আসাটা অস্বাভাবিক ঠেকবে তার কাছে। কলমি এ বিষয়ে কী জবাব দেবে? কী ব্যাখ্যা দেবে? হঠাৎ কেমন অস্বস্তি এবং দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় সে।
সারা শরীরে জড়িয়ে থাকা অচেনা ফরাসি সৌরভ কলমির অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। কিছু সময়ের মধ্যে ঘরে ফেরার পর দুলালের কৌতূহলী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। শরীরে জড়িয়ে থাকা বিদেশি পারফিউমের সৌরভ যদি কোনোভাবে ধুয়ে মুছে দূর করা যেত... কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব? হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে কলমি। ঘরে ফিরলে না হয় গোসল করলে সেই সৌরভটা কমে আসত। কিন্তু তার আগে তো সেটা কমানো কিংবা দূর করা সম্ভব নয়। তখনই আশেপাশে বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে আবার। প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হতে থাকে। একটু পরেই আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়।
ঝুমবৃষ্টির মধ্যে নিজেকে রক্ষা করতে কলমি কোনো চেষ্টাই করে না। বরং সে খুশি হয়। যাক, তাহলে শরীরে জড়িয়ে থাকা অচেনা সৌরভটা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মুছে যাবে। রাস্তায় ঝুমবৃষ্টির মধ্যে তার সঙ্গে আর কেউ না হাঁটলেও একাকী সে হাঁটতে থাকে ফুটপাত ধরে। মালিবাগ বস্তি পর্যন্ত পৌঁছাতে তাকে অন্তত আরো বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হবে।
মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে ঢাকা শহরজুড়ে। সেই বৃষ্টিতে শহরের অনেক ময়লা-আবর্জনা, ধুলোবালি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার বৃষ্টিতে দ্রুত পবিত্র হয়ে উঠছে শহরের পরিবেশ। ঝুমবৃষ্টিতে কলমির শরীরে জড়িয়ে থাকা বিদেশি পারফিউমের অচেনা সৌরভটাও ধুয়ে মুছে যেতে থাকে। যা কলমিকে অনেকটা হালকা, ভারমুক্ত করে। সেই অচেনা ফরাসি সৌরভটা এতক্ষণ চেপে বসেছিল তার মধ্যে।