দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে অন্যান্য খাতের মতো গণপরিবহনে চলছে নৈরাজ্য। সরকার ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও মানছে না বাসমালিক কর্তৃপক্ষ। সারা দেশে অধিকাংশ গণপরিবহন নিজের ইচ্ছামতো ভাড়া নিচ্ছে। এতে চরম হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়ছে যাত্রীরা। কখনো কখনো ভাড়া নিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন যাত্রীরা। রাজধানীতে ওয়েবিল ও চেকার বহাল রেখে একই গন্তব্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বাসগুলোর সুপারভাইজাররা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। এমনকী একই বাস কোম্পানির স্টাফরা একই গন্তব্যের জন্য আলাদা ভাড়া আদায় করছেন। বাস মালিকদের নির্দেশেই সরকার নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান একাধিক বাসচালক।? এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে অন্তত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে পণ্য পরিবহনের ভাড়া। রাজধানীতে বিভিন্ন রুটের বাসে ব্যবহৃত ওয়েবিল প্রথা বাতিল ঘোষণা করা হলেও তা মানছেন না পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। পাশাপাশি স্টপেজ বাদেও খোলা থাকছে বাসের দরজা, চলছে যাত্রী ওঠা-নামা। অনেক বাসে ভাড়ার নতুন চার্ট থাকলেও ইচ্ছেমতো বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, অভিযোগ যাত্রীদের। এসব বিষয়ে তদারকির দাবি তাদের।
এদিকে ওয়েবিল ব্যবস্থায়, বাসে উঠে পরের স্টপেজে নামলেও পরবর্তী ওয়েবিলের স্থান পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয় যাত্রীদের। সম্প্রতি পরিবহন মালিক সমিতি ওয়েবিল প্রথা বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে তা এখনো কার্যকর হয়নি।
গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় ও অন্যান্য অনিয়ম বন্ধে বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক সমিতির ৯টি ভিজিলেন্স টিম কাজ করার কথা থাকলে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি রাজধানীতে।
অভিযোগ স্বীকার করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত বলেন, যেসব বাসমালিক ওয়েবিল-চেকার পদ্ধতি বাতিল করেছেন, তারা আগের থেকে কম টাকা জমা পাচ্ছেন। সে কারণে অনেকেই এখনো ওয়েবিল-চেকার পদ্ধতি বহাল রেখেছেন। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান আসবে। নিয়মিত বাসে যাতায়াত করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রেদোয়ান শাফিন বলেন, ভাড়া নিয়ে ওদের সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই। ওরা কারো কথা শোনে না। আসলে আমরা সাধারণ যাত্রীরা ওদের কাছে জিম্মি।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে বিআরটিএর পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং করার কথা থাকলেও মিরপুর-গুলিস্তান রুটে ভাড়ার বিষয়ে কাউকে তদারকি করতে দেখা যায়নি। ফলে ভাড়া নিয়ে চলছে নৈরাজ্য।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে যাত্রীদের সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাস্তায় গাড়ি চলাচলের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই কোনো ধরনের বাহানা দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ নেই।
- ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৫০ শতাংশ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে অন্তত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে পণ্য পরিবহনের ভাড়া। ডিজেলের দর সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়লেও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপ মালিক-চালকরা তার চেয়ে বেশি ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। গত ৫ আগস্ট রাত ১২টা থেকে সরকার জ্বালানি তেলের দর পুনর্র্নির্ধারণ করে। প্রতি লিটার ডিজেলের দর করা হয় ১১৪ টাকা, আগে যা ছিল ৮০ টাকা। ৫০ শতাংশ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যে পণ্য পরিবহনে আগে ১০ হাজার টাকা গুনতে হতো, এখন দিতে হচ্ছে ১৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, অতীতে যে হারে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, সেই হারে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। এবারও তাই করা হয়েছে।
ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানচালক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মনির বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম একটি রিটার্ন ট্রিপে ডিজেল লাগে ১৫০ লিটার। ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে এক ট্রিপের ডিজেলের জন্য ৫ হাজার ১০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে জীবন যাত্রার খরচও বেড়েছে। সেই খরচ ভাড়া থেকেই তুলতে হচ্ছে। তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে আগে ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে এক ট্রিপের ভাড়া ছিল ১৪ থেকে ১৭ হাজার টাকা। এখন ডিজেলের জন্য ৫ হাজার ১০০ টাকা অতিরিক্ত গেলেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৭ হাজার টাকা।