খয়ের খাঁ, গৌরী সেন ও রসাতল

বাংলা ভাষায় কিছু কিছু শব্দ বা শব্দগুচ্ছ আছে, যা আমাদের সমাজ-জীবনের সঙ্গে ভীষণরকম লাগসই। ভিন্ন মানে নিয়ে যে শব্দগুচ্ছ টিকে আছে, এগুলোকে ব্যাকরণের ভাষায় বাগ্ধারা বলে। বাগ্ধারা শব্দের আভিধানিক অর্থ কথার ভঙ্গি বা কথার ঢং। বিশেষ প্রসঙ্গে শব্দের বিশিষ্টার্থক প্রয়োগের ফলে বাংলায় বহু বাগ্ধারা তৈরি হয়েছে। প্রয়োগের গুণে এসব শব্দগুচ্ছ বা বাক্যাংশ আভিধানিক অর্থ ছাপিয়ে বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে। শুধু বাগ্ধারাই নয়, কিছু কিছু শব্দও তার আসল মানে ছাপিয়ে নতুন মানে নিয়ে বাংলা ভাষার সংসারে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। এসব শব্দ ও বাগ্ধারা বাংলা ভাষার বিশেষ সম্পদ।

বাংলা ভাষায় একটি প্রচলিত বাগ্ধারা হচ্ছে খয়ের খাঁ। চাটুকার বা তোষামোদি বোঝাতে শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। এটাও বিবর্তিত হয়ে বর্তমান মানে ধারণ করেছে। আরবি ‘খায়ের’ মানে শুভ আর ফারসি ‘খাহ্’ মানে চাওয়া, এ দুয়ে মিলে শব্দবন্ধটি শুদ্ধার্থে বোঝাচ্ছিল ‘শুভার্থী’। তবে আমাদের দেশে নকল শুভার্থী বেড়ে গেলে ‘খায়ের খাহ্’ হয়ে যায় ‘খয়ের খাঁ’ এবং বোঝাতে থাকে চাটুকার। এসব স্তাবকের মোসাহেবি আরো বেড়ে গেলে তুচ্ছার্থে ‘খয়ের খাঁ’ হয়ে গেল ‘চামচা’, বেলচার থেকে ক্ষুদ্র বলেই হয়তো। আমাদের দেশে এখন আর যা কিছুরই অভাব থাকুক না কেন, ‘খয়ের খাঁ’ বা ‘চামচা’র কোনো অভাব নেই। বিভিন্ন অফিসে, প্রশাসনে, গণমাধ্যমে এমনকি পরিবারে পর্যন্ত ‘খয়ের খাঁ’-দের দৌরাত্ম্য!

‘খয়ের খাঁ’ নিয়ে একটি কৌতুক আছে। নবম শ্রেণির ষাণ্মাসিক পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছিল, ‘খয়ের খাঁ’ শব্দবন্ধ দ্বারা বাক্য রচনার। ষাণ্মাসিক পরীক্ষার উত্তরপত্র ছাত্রদের ফেরত দেওয়া হতো, এই স্থলে ফেরত দেওয়ার আগে শিক্ষক সাহেব তার উত্তরপত্র খুলে ক্লাসে পাঠ করে শোনালেন। সে লিখেছে, ‘পান খেয়ে তোর মুখটা ঠিকমতো লাল হয়নি, তুই আর একটু খয়ের খাঁ’! আমাদের দেশে শিক্ষার মান অবশ্য এখন এমনই।

উত্তমমধ্যমের কথাই ধরা যাক। ‘উত্তমমধ্যম’ বলতে বোঝাত যুগপৎ ‘উত্তম’-রূপের প্রহার আর ‘মধ্যম’-মানের লাঞ্ছনা, যেমন :মেরে ন্যাংটা করে বের করে দেওয়া। হালের উত্তেজনাপ্রবণ উত্তালকালে ওজস্বী শব্দবন্ধটি পালিয়ে গেল নিরীহ একটি শব্দের ঠেলায়, ‘ধোলাই’, যা প্রহার এবং লাঞ্ছনার যোগফলের চেয়েও বড় বালাই। সমাজে উত্তমমধ্যম এখন অনেকটাই কমে এসেছে। তবে চোর-ছ্যাঁচর-ছিনতাইকারীরা এখনো উত্তমমধ্যম আতঙ্কে থাকে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে এই আতঙ্ক নেই, তা কিন্তু বলা যাবে না। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে বিক্ষুব্ধ জনগণের উত্তমমধ্যম বা ধোলাই-আতঙ্কে দেশ ছেড়ে ভাগতে বাধ্য হয়েছেন। পাপ আসলে বাপকেও ছাড়ে না। কাজেই সাধু সাবধান!

সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের ইডেন কলেজ শাখার এক নেত্রী নানা ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলে আলোচিত হয়েছেন। ক্ষমতার রাজনীতির ‘মদ’ গিলে ছাত্রছাত্রীদের বেসামাল কথা, বেসামাল আচরণ এখন অবশ্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ছাত্র শব্দটির চলমান অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া। বাংলায় ছাত্র শব্দের নারীবাচক রূপ হলো ছাত্রী। সংস্কৃতে ছাত্রী বলতে বোঝায় ছাত্রের পত্নী বা স্ত্রী, ব্যাকরণ অনুযায়ী ছাত্রের নারীবাচক রূপ হলো ছাত্রা। ছাত্র শব্দের মূল অর্থ কিন্তু—যে গুরুর দোষ ঢেকে রাখে। এ দেশে একালের ছাত্ররা তো গুরুর খুঁত খুঁজে বেড়ায়, তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার জন্য!

প্রসঙ্গত, অভ্যুত্থান শব্দটির কথাও বলা যায়। ‘অভু্যত্থান’ আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং বেদনাদায়ক একটি শব্দ। বাংলাদেশ দেখেছে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে অভ্যুত্থানের কেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সামরিক অভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে অনেক অবাঞ্ছিত পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। অথচ বাস্তবিক অনর্থের হোতা এই অভ্যুত্থান শব্দটির মৌলিক অর্থ বিপরীত—কাউকে সম্মান দেখানোর জন্য আসন থেকে ওঠা বা উন্নত, উদ্গত, অভ্যুত্থিত হওয়া ইত্যাদি। শব্দের স্বেচ্ছাচারিতা এমনি যে একালে ‘অভ্যুত্থিত’ হওয়া বা আসন থেকে ওঠা কাউকে সম্মান দেখানোর জন্য নয়, ল্যাং মেরে ক্ষমতাসীনের আসনটি বা গদিটি দখল করার জন্য। এই তৎপরতা গোপনে-প্রকাশ্যে অবশ্য প্রতিনিয়ত চলছে।

বাংলায় আরেকটি জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে—টাকা লাগে দেবে গৌরী সেন। এই গৌরী সেন সপ্তদশ শতাব্দীর লোক, পশ্চিমবঙ্গের হুগলির বাসিন্দা। কথিত আছে, ব্যবসাসূত্রে তিনি দস্তার পরিবর্তে এক জাহাজ রুপো পেয়েছিলেন। সেই লাভের টাকা তিনি সত্কর্মে ব্যয় করবেন বলে সংকল্প করেন। সবার প্রয়োজনে মুক্তহস্তে দান করে তিনি প্রবাদে স্থান করে নিয়েছেন (সূত্র :সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান)। বাংলাদেশে বর্তমানে যে ধরনের ভয়াবহ অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, রপ্তানি আয় কমে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, তাতে গৌরী সেন ছাড়া আমাদের রক্ষা পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার।

আসলে শব্দ খুব মজার জিনিস। একেক শব্দের একেক তামাশা। ফারসি থেকে আসা ‘কারচোবি’—শব্দটির কথাই ধরা যাক। এর অর্থ হলো কাপড় বা কাঠের ওপর লতাপাতা বা ফলফুলের সূক্ষ্ম-জটিল নকশা তোলার কাজ করা। বাংলায় এসে শব্দটি হয়ে গেল ‘কারচুপি’, যার অর্থ সূক্ষ্ম চালাকি। এ দেশে পরাজিত পক্ষ সব সময়ই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে। অপকর্মটির ব্যাপ্তি বোঝাতে সূক্ষ্মও ডবল হয়ে যায়, ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’।

এর চেয়েও মারাত্মক দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে ‘কারসাজি’ শব্দটি। মূল ভাষা ফারসিতে শব্দটির অর্থ হলো কার্য-সম্পাদনকারী কিংবা নির্মাতা। তবে ‘কারসাজ’ প্রধানত সবচেয়ে বড় নির্মাতা ‘বিধাতা’কেই বোঝায়। সৃষ্টিকর্তার কাজ সৃষ্টি করা বা কারসাজি করা, যা করার গরজে তিনি এ বিশ্বব্রহ্মা‌ণ্ডের সকল ভাঙাগড়ার নিয়ামকও বটেন। কী সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড দেখুন, বাংলা ভাষায় এসে ‘রহমান’-এর এ মহত্ কাজটি হয়ে গেল ‘শয়তান’-এর অসৎ কাজ। আমরা ‘কারসাজি’ দিয়ে কেবল ‘চালাকি’ই নয়, ‘প্রতারণা’ই বোঝাই!

শব্দের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয় অগণিত কারণে। যেমন বাঙালির মনের রোগের চেয়ে দেহের রোগ শতগুণ বেশি বলে ‘ব্যাধি’ শব্দটির প্রতাপ ‘আধি’ শব্দটিকে ভাষা থেকে প্রায় তাড়িয়েই দিয়েছে। আমরা কি কখনো কোনো মনোবিকারগ্রস্ত ব্যক্তির স্ত্রীকে জিগ্যেস করেছি যে আপনার স্বামীর ‘আধি’র অবস্থাটি এখন কেমন? করলেও তিনি বলবেন, তার কি ‘আধিব্যাধি’র আর শেষ আছে? মানে ‘আধি’কে ঘাড়ে নিয়েও মুখে চলে আসে ‘ব্যাধি’-শব্দটি। আধি মানে হচ্ছে দুশ্চিন্তা, ভাবনা, উৎকণ্ঠা। আর আধিব্যাধি মানে হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক রোগ (আধিব্যাধি নাহি হয় সর্পের দংশন—কবি কঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)।

‘আটঘাট’ বেঁধে কাজে নামতে হয় কেবল তবলচিকে। তবলার কাড়ির চতুর্দিকে মোট আটটি কাঠের গুটির ওপর চারটি করে চামড়ার ফিতা থাকে। গুটিগুলির মধ্যেকার আটটি ফাঁককে বলে ‘আটঘাট’। আটটি গুটির ওপরই হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ফিতেগুলিকে লুজ-টাইট করে সুষমভাবে স্বরের স্কেল মেলাতে হয়। তবেই তবলা কাঙ্ক্ষিত সুরে বাজে। অথচ শব্দবন্ধের এমনি দাপট যে আপনি শত শত কাজের ‘হাজার ঘাট’ বেঁধে আপনার ষড়তল ভবনটির নির্মাণে লাগলেও সবাই বলবে লোকটি ‘আটঘাট’ বেঁধে লেগেছে।

রসাতল মানে অধঃপাত, ধ্বংস, বিনাশ, অধোগতি ইত্যাদি। তাই আমরা রসাতলে যাই ভাষার নৌকায় চড়ে, রূপকভাবে। সোজা কথায় ধ্বংস বা অধঃপতনের ব্যাপকতা বোঝাতে আমরা রসাতল শব্দটির ঘাড়ে চাপি।

রসাতল মানে কিন্তু ‘রসের অতল’ নয়। এমনিতে রস কিন্তু মোটেও খারাপ জিনিস নয়। খেজুরের রস, তালের রস, আখের রস, রসগোল্লার রস—সব রসই মজার। তাহলে রসাতল খারাপ হবে কেন? রসাতল শব্দটি এসেছে ভারতীয় পুরাণ থেকে। স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল নিয়েই ভারতীয় পুরাণের ত্রিভুবন। আবার পাতালের রয়েছে সাতটি স্তর। স্তরগুলো হচ্ছে অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। কিন্তু রসাতল বলতে যদি সর্বনাশের চরমসীমা নির্দেশিত হয়, তাহলে পাতালের দোষ ছিল কোথায়? পাতাল তো রসাতল থেকেও গভীর। আলবেরুনি তার বিখ্যাত ভারততত্ত্বে পাতালের যে সাতটি স্তর বর্ণনা করেছেন, তাতে কিন্তু রসাতলকেই সবচেয়ে গভীর দেখানো হয়েছে। পরে পাতাল কেন সবচেয়ে গভীর হয়ে গেল, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

তেমনি জানা যায় না, বাংলা ভাষা কেন মানুষবিশেষকে ত্রিভুবনের স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের শেষ বা সপ্তম তলে, মানে খাস ‘পাতালে’, ঠেলে না-দিয়ে ষষ্ঠ তলটিতে, মানে ‘রসাতলে’ রেখে দিচ্ছে। সম্ভবত মন্দ লোকটিকে আত্মশুদ্ধির লাস্ট চান্সটি দিতেই তাকে নিম্নতম কৃষ্ণগহ্বরটি থেকে বাঁচিয়ে রাখছে!

লেখক : রম্যরচয়িতা