সুপেয় পানির সংকট ও উপকূলের শিশুরা

নদীমাতৃক বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সুপেয় পানির আধার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুপেয় পানির আধার এখন ধুঁকছে। লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে পুরো উপকূলজুড়ে। সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে উপকূলের শিশুসহ সব বয়সের মানুষ। লবণাক্ততা ফসল উত্পাদনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পানির প্রবাহজনিত ভারসাম্যতার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের দিকে চলে আসে। ফলে জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধির কারণে লোনাপানি স্থলভাগে প্রবেশ করে। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে লবণাক্ততাও বাড়বে। সন্দেহ নেই, কম বৃষ্টির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব আরো বেশি মাত্রায় প্রভাব ফেলবে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা জেলায় লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এক এলাকার লবণাক্ততা আশপাশের অন্য এলাকায় মাটির ওপরও প্রভাব বিস্তার করছে।

দেশের আবাদি জমির ৩০ ভাগ উপকূলীয় এলাকায়। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, দেশের উপকূলবর্তী প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চল লবণাক্ততা দ্বারা সরাসরি আক্রান্ত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮.৬ লাখ হেক্টর উপকূলীয় এলাকার মধ্যে ১০.৫৬ লাখ হেক্টর এলাকা বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। লবণাক্ততাসহ জলবায়ুগত বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উপকূলের মানুষ এলাকা ছাড়ছে। উদ্বাস্তু শিশুরা উপকূল ছেড়ে অন্য স্থানে গেলেও সেখানেও যে বিশুদ্ধ পানিপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে সে নিশ্চয়তা নেই। উপকূলের অধিকাংশ গ্রামে বিশুদ্ধ পানির একমাত্র ভরসা ‘গভীর নলকূপ’ (ডিপ টিউবওয়েল)। গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভ থেকে প্রতিদিন গ্রাম পর্যায়ে হাজার হাজার লিটার পানি ওঠানো হচ্ছে। উপকূলের হাজার হাজার গ্রামের প্রায় সব পরিবারে এখন টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ পানি কিনতে হচ্ছে। যেসব পরিবার বিশুদ্ধ পানি কিনতে পারছে না তাদের লবণ পানি পান করে জীবন চালাতে হচ্ছে!

লবণ পানি খাওয়া ও স্নান করার কাজে ব্যবহার করায় শিশুদের চর্মরোগ ও বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ফুসকুড়ি, খোসপাঁচড়া, চুলকানির মতো সাধারণ সমস্যা লেগেই আছে। লবণ পানি পান করার কারণে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগতে ভুগতে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় শিশুরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উপকূলের লবণাক্ত এলাকায় ডিপ টিউবওয়েল দিয়ে পানি তুলতে তুলতে একটা সময় পানির স্তর স্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাবে। ভূগর্ভস্থ পানি না পাওয়া গেলে তখন উপকূলবাসীর সবার পানি কোত্থেকে আসবে? উপকূলে বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তায় এনজিও ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে এলাকায় এলাকায় যে পুকুর ফিল্টার (পিএসএফ) ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেগুলোও ঠিকঠাক কাজ করে না। এগুলো একবার নষ্ট হলে চালু করতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে।  

উপকূলের শিশুদের এগিয়ে যাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা লবণাক্ততা। শিশুরা যদি বিশুদ্ধ পানি না পায় তাহলে সুস্থ ও স্বাভাবিক ভবিষ্যত্ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের তাত্ক্ষণিক কোনো পদ্ধতি নেই। বোধ করি এ সমস্যা বাড়বে নাকি কমবে তা সময়ই বলবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অভিযোজনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। সর্বোপরি উপকূলের মিষ্টি পানির জলাধার  সংরক্ষণ করতে হবে গুরুত্ব দিয়ে।

মুন্সীগঞ্জ