সুশৃঙ্খলা ব্যতীত আমাদের উন্নতিসাধন হইবে না

রাজধানীর কাওরান বাজারে এফডিসির সামনের রেলগেট। ট্রেন আসিতেছে। তীব্র শব্দে বাজিয়া উঠিতেছে সাইরেন। নামিয়া গিয়াছে লেভেলক্রসিং বার, তাহার পরও দুই পাশের সকল কিছু থমকাইয়া যায় নাই। বরং চাঞ্চল্য যেন বাড়িয়াছে একটু বেশি। এইখানে গেটে দুইটি বার থাকার কথা, কিন্তু রহিয়াছে চারটি। দেখা যায়, ট্রেন আসিবার কিছুক্ষণ পূর্বে যখন বার নামাইয়া দেওয়া হয়, তখন উলটা পাশ দিয়া রিকশা, মোটরসাইকেল, কখনো কখনো মাইক্রোবাসও অপর প্রান্ত দিয়া আগাইয়া আসে। তাহাদের আগ্রহ থাকে, যখন বার উঠিয়া যাইবে, তখন সকলের আগে অন্য পাশে গিয়া বাহির হইয়া যাইবে। ইহাতে জটলা আরো বাড়িয়া যায়। কিছুদিন পূর্বে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসের ১১ আরোহীর মৃত্যুর পর লেভেলক্রসিং লইয়া অনেক লেখালেখি হইয়াছে। তবে রাজধানীর নানা রেলগেটে রিকশা বা মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে যেই অস্থিরতা আর নিয়ম না মানিবার প্রবণতা দেখা যায়, তাহা যেন বুঝাইয়া দেয়, আমরা কতখানি অস্থির, অসহিষ্ণু ও ধৈর্যহীন। উল্লেখ থাকে যে, কাওরান বাজার ও খিলক্ষেত রেলগেটে সবচাইতে বেশি মানুষ মারা গিয়াছে ট্রেনে কাটা পড়িয়া। একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলিয়াছিলেন, পৃথিবীতে আইন অমান্যকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। অথচ আমাদের দেশের মানুষ বিদেশে গিয়া ঠিকই আইন মানিয়া চলিতেছে।

নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগিতে পারে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির নাগরিকরা কেন পৃথিবীতে আইন অমান্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়? এই প্রশ্নের উত্তরে জড়াইয়া রহিয়াছে এই উপমহাদেশের মূলগত কিছু বৈশিষ্ট্য। আমাদের নৃতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে ইহার উত্তর পাওয়া যাইতে পারে। রাস্তা দখল করিয়া হাটবাজার, খালবিল দখল করিয়া প­ট বিক্রয়, ফুটপাত দখল করিয়া সারি সারি দোকান, নিয়ম না মানিয়া রাস্তা ও রেললাইন পারাপার; অতঃপর দুর্ঘটনা—পত্রিকার পাতায় নিত্যদিন আমরা এমন অসংখ্য খবর দেখি। যিনি মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে রাস্তা বা রেললাইন পার হইতেছেন, তিনি অবশ্যই জানেন যে, এই অনিয়মের জন্য যে কোনো মুহূর্তে তাহার মৃত্যু হইতে পারে। কিন্তু এই কাজ ঐ লোকটি আরো অসংখ্য মানুষকে করিতে দেখিয়াছেন। অনিয়ম করিয়া কয়েক হাজারে একজন হয়তো দুর্ঘটনার শিকার হয়, কিন্তু যাহারা ভাগ্যক্রমে বাঁচিয়া গিয়াছে, তাহাদের দেখিয়া অন্যরাও উত্সাহিত হয় একইভাবে পথ চলিতে। ইহাই মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব।

মনস্তাত্ত্বিকরা মনে করেন, মানুষ স্বভাবগতভাবেই বিশৃঙ্খল প্রাণী। কিন্তু যদি আইন ভাঙিবার কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থদণ্ড বা  যে কোনো ধরনের দণ্ড ভোগ করিতে হয়—তাহা হইলে সেই দণ্ডের ভয়ে আইন না মানিয়া কাহারো কোনো উপায় থাকে না। এই জন্য বাঙালিরা যখন উন্নত দেশে যায়, তখন ঐ দেশটির আইনকানুন-নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটায় না। কারণ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইলেই তাহাকে বেশ ভালো অঙ্কের অর্থ জরিমানা দিতে হইবে। বিদেশের মতো একই চিত্র আমরা ঢাকায় জাহাঙ্গীর গেট পার হইলেই দেখিতে পাই। হয়তো শুনিতে অন্যরকম মনে হইতে পারে, কিন্তু ইহাই বাস্তবতা যে, আমাদের সেনানিয়ন্ত্রিত অংশে বা অঞ্চলে সকলেই নিয়মকানুন মানিয়াই চলাচল করে। সেই সকল অঞ্চল দেখিলে মনে হয় না যে আমরা বাংলাদেশেই আছি! একই দেশের মধ্যে এই যে শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলার ভিন্ন দুইটি চিত্র—ইহা আমাদের এই বার্তা দেয় যে, শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য নিশ্চিত দণ্ডের ভয় থাকিলে মানুষ সেইখানে নিয়মকানুন মানিবেই।

মনে রাখিতে হইবে, আইন ও নিয়মকানুন না মানিয়া পৃথিবীর কোনো দেশ উন্নতি করিতে পারে নাই। প্রকৃতি তথা বিশ্বজগতের ভিতরেও রহিয়াছে সুশৃঙ্খলতার অপূর্ব বিন্যাস। সেই অপূর্ব বিন্যাস দেখিয়া বুঝা যায়, সুশৃঙ্খলাই এই জগতের সবচাইতে বড় সৌন্দর্য। আমাদেরও সেই সৌন্দর্যকে ধারণ করিতে হইবে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে আমরা কখনই জাতি হিসাবে উন্নতিসাধন করিতে পারিব না।