পৃথিবীতে যতদিন প্রাণ থাকবে ততদিন খাদ্যের চাহিদা থাকবে। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার, বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ। প্রাকৃতিক কারণে মাঝেমধ্যে খাদ্যের স্বল্পতা দেখা দিতে পারে, সেটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু কৃত্রিমভাবে খাদ্যসংকট সৃষ্টি! সেটা কি মানা যায়? জীবনধারণের উপকরণ রূপান্তরিত হচ্ছে জৈব-জ্বালানিতে। এটি কি কোনো কল্যাণ-বিশ্বের আচরণ হতে পারে? ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার তথ্য বলছে, ‘ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য প্রতিদিন ১৭ হাজার টন রান্নার তেল যানবাহনে ঢুকাচ্ছে।’ এর অধিকাংশই রেপসিড এবং সূর্যমুখী তেল। বিশ্ব জুড়ে যেখানে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা আমাদেরকে রেড সিগন্যাল দিচ্ছে, সেখানে ১০ শতাংশ খাদ্যশস্য জৈব জ্বালানিতে পরিণত হচ্ছে। অথচ এই খাদ্যশস্যে ১.৯ বিলিয়ন মানুষের এক বছরের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ বলছে, ‘পৃথিবীর অধিকাংশ শস্য মানুষ খায় না। যেখানে মোট উত্পাদিত খাদ্যশস্য ১৯০৭ মিলিয়ন টন সেখানে মানুষ গ্রহণ করতে পারে ১ হাজার ৩৩৭ মিলিয়ন টন আর পশুখাদ্য, জৈব-জ্বালানি ও অন্যান্য রূপে ব্যবহৃত হয় ১ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন টন।’ আসলে এখানে স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, মানুষ খায় না, নাকি খেতে পায় না?
জাতিসংঘের The Global Report on Food Crises 2022 বলছে, বিশ্বের ৫৩টি দেশ বা অঞ্চলের প্রায় ১৯৩ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পুষ্টিহীনতার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিতে আছে পাঁচ বছর বয়সের নিচের ২৬ মিলিয়ন শিশু। বিদ্যমান পরিস্থিতিকে Integrated Food Security Phase Classification অনুযায়ী তিন বা ততোর্ধ্বসূচক মাত্রা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৫/১ ধারায় প্রত্যেক মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ আছে। খাদ্য অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশও বটে। তবে নিছক কাগজ কলমে আর ঘোষণায় মানুষের খাদ্য অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করা যাচ্ছে তা নিয়ে সংশয় নয়, আছে গভীর শঙ্কা। কারণ মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
কালের হিসেবে বর্তমানে আমরা অতি আধুনিক যুগে বসবাস করছি সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের বিবেকবিবর্জিত, মানবিকতাবর্জিত উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তগুলো আধুনিকতার মূলনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বা কতখানি সাংঘর্ষিক? কোভিড ১৯-এর প্রতিকূল ঢেউ মোকাবিলা করে বিশ্ব যখন নতুন করে হাঁটতে শুরু করল তখন আবারও হোঁচট খেলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। অনুসন্ধানী সংস্থা Transport & Environment বলছে, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে প্রতিদিন ১০ হাজার টন গমজাত জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে যানবাহনে।’ কৃষকের খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতার একটা সীমা আছে। মানুষের খাদ্য চাহিদারও আছে একটা সীমা যদিও সেটি ক্রমবর্ধমান হারে তা বাড়ছে। তবে জৈব জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে খাদ্যশস্যের ব্যবহার খাদ্য উৎপাদন সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সীমিত মজুদ ও জোগান খাদ্যশস্যের মূল্যকে ত্বরান্বিত করছে। এই পরিস্থিতি মানুষের খাদ্যসংকট ও খাদ্যমূল্য দুটিকেই চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটি যুগপত্ভাবে আর্থিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
স্বার্থ-সর্বস্বতা কোন পর্যায়ে গেলে মানুষের মুখের খাবার কেড়ে নিয়ে গাড়ির জ্বালানি, ঘরের বিদ্যুৎ বা অন্যান্য কাজের জন্য খাদ্যশস্যকে ব্যবহার করা হয়। আত্মকেন্দ্রিকতা কোন পর্যায়ে গেলে দেশগুলো হঠাৎ শস্য রপ্তানি কমিয়ে বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করে। এমন কৃত্রিম সংকটে FAO, WFP, G8 সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী? প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতার জায়গাটা কতটা স্বচ্ছ? যারা খাদ্য নিরাপত্তা, সর্বজনীন পুষ্টি, কৃষকের উৎপাদন স্বায়ত্তশাসন, কৃষিগত উদ্ভাবন প্রোণদনা, খাদ্য সার্বভৌমত্ব, টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার কথা বলে, তারা কতটুকু জবাবদিহি করতে পারছে?
নীল আকাশের নিচে দিগন্ত প্লাবিত সোনালি রঙের খাদ্যশস্য! বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলছে অবিরাম! এটি কোনো শিল্পীর আঁকা তৈলচিত্র নয়। এটি ছিল ইউরোপের শস্য উৎপাদনের বাস্তবতা, খাদ্য নিরাপত্তা ও নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু এখন সাধারণ শস্যভূমিতে চাষ হচ্ছে জৈব জ্বালানির ‘ফ্লেক্স ক্রপস’ অর্থাৎ সয়া এবং ভুট্টার মতো পণ্য। উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজারদর বিবেচনা করে এসব পণ্যের উপযোগ-রূপ নির্ধারণ করা। অর্থাৎ, খাদ্য হিসেবে দর বেশি হলে এসব শস্য খাদ্যপণ্য হিসেবে পরিবেশিত হবে। আর পশুখাদ্য বা জৈব জ্বালানি হিসেবে বাজার দর চড়া থাকলে শস্যকে সে রূপে বাজারে ছাড়া হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও অতি মুনাফাকে প্রাধান্য দিতে বিভিন্ন দেশের বন উজাড় করা হচ্ছে, জলাভূমি বিনষ্ট করা হচ্ছে, ক্ষুদ্র কৃষক এবং আদিবাসীদের জমি দখল করা হচ্ছে। তাঞ্জানিয়াতে ধান ও ভুট্টার জমিতে আখ ও যাত্রোফা গাছ (যার বীজ দিয়ে জ্বালানি উৎপাদিত হয়) লাগানো হচ্ছে। এটি শুধু মানববিনাশী নয়, এটি প্রকৃতিবিনাশীও বটে। বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য আজ প্রত্যক্ষভাবে হুমকির সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে এসবের দায়কে উপেক্ষা করছে বিশ্বশক্তি। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও সম্প্রতি জ্বালানির খরচ কমাতে এবং পেট্রোলের সঙ্গে যোগ করতে ইথানল জৈব জ্বালানির পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। আমরা জানি যে, যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর ৬০-৭০ শতাংশ ভুট্টা উৎপাদন করে, যেটি বিশ্বের প্রধান তিন খাদ্যশস্যের অন্যতম। সেই ভুট্টার বড় অংশ যখন ইথানল তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তখন বিশ্বব্যাপী মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি শৃঙ্খল চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। খাদ্যের অভাব বা অতিমূল্য দেশে দেশে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, খাদ্য সংকটের কারণে দেশে দেশে ক্ষেত্রবিশেষে ২ থেকে ১০ শতাংশ ক্যালোরি গ্রহণ মাত্রা হ্রাস পাচ্ছে। অপ্রতুল খাদ্যের কারণে পাপুয়ানিউগিনি, মৌরিতানিয়া, মরোক্কো, সেনেগাল, ইয়েমেনসহ অনুন্নত দেশসমূহে খাদ্যদাঙ্গা বাধার সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে। ফলে মার্কিন দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের খাদ্যের চেয়ে গাড়ির খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়টি মানব সভ্যতার জন্য এক ধরনের হুমকি।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘খাদ্য সমস্যার সমাধান’ শীর্ষক কবিতায় উন্নত দেশসমূহের খাদ্য ও জ্বালানি নীতির আজকের রূপ ফুটে উঠেছে এভাবে— বন্ধু : ঘরে আমার চাল বাড়ন্ত/তোমার কাছে তাই,/এলাম ছুটে, আমায় কিছু/চাল ধার দাও ভাই। মজুতদার : দাঁড়াও তবে, বাড়ির ভেতর/একটু ঘুরে আসি,/চালের সঙ্গে ফাউও পাবে/ফুটবে মুখে হাসি। মজুতদার : এই নাও ভাই, চাল কুমড়ো,/আমায় খাতির করো,/চালও পেলে কুমড়োও পেলে/ লাভটা হল বড়। মজুতদারের মতো ঠিক এমন সমাধান চায়না অধিকার হারা অন্নহারা বিশ্ববাসী।
লেখক : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি