ওয়াচডগ আসলে কী ডগ?

আমেরিকার পুলিশ অপরাধী শনাক্ত ও ধরতে বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে, যাদের বলে পুলিশডগ। অনেক ডিজেবল মানুষ নিজেদের সাহায্যার্থে লাইসেন্সধারী ট্রেনিংপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে, যাদের বলে সার্ভিসডগ। আর ওয়াচডগ হলো আমেরিকান সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা শাসন বিভাগ তথা আমলাযন্ত্রের কাজ মনিটর করে ও তাদের অন্যায়, বেআইনি কার্যক্রম তদন্ত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করে।

আমেরিকা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের দেশ। বিশাল ক্ষমতাধারী শাসন বিভাগ তথা আমলাতন্ত্রের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং করতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা রয়েছে। যেটিকে সহজ বাংলায় বলা যায় আমলাতন্ত্রের লাগাম। আমলাতন্ত্রের ওয়াচডগ হিসেবে অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেল, হুইসেল ব্লোয়ার ও অম্বোসম্যান্ট আমলাতন্ত্রের লাগাম হিসেবে কাজ করছে। সে কারণেই সদ্য বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম, ও প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে কংগ্রেসের অভিশংসনের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

আমেরিকার বিশাল আমলাতন্ত্রের গোড়াপত্তন ঘটে ১৭৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন কর্তৃক তিনটি ফেডারেল মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে। ক্রমে ক্রমে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো বৃদ্ধি, অর্থনীতি, পুঁজিবাদের বিকাশ, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন জটিলতা নিরসনকল্পে আমলাতন্ত্র ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, শ্রমবাজার, শিল্প উত্পাদন ও কৃষি বহুলাকারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মুক্তবাজার অর্থনীতি, প্রশাসনকে ঢেলে সাজিয়ে শুধু শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত না করে, কর্মমুখর, গণমুখী ও জনকল্যাণকর করা হয়। জনগণকে সব কর্মকাণ্ডের মূল ধরে প্রশাসনকে তার উত্পাদনমুখী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করতে আমলাতন্ত্রের প্রসার ঘটানো হয়। যে কারণে পশ্চিমা গণতন্ত্রে আমলাযন্ত্র নিজেদের মনে করে জনগণের সেবক, জনগণকে প্রভুর প্রতিভূতুল্য গণ্য করে, কাজকে প্রাধান্য দিয়ে, প্রশাসনকে জনগণ তথা কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহিতে রেখে আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আমেরিকান আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী লাগামটি হলো ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিস। প্রত্যেকটি সরকারি এজেন্সি বা দপ্তরে একটি করে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ইন্সপেক্টর জেনারেলের অফিস আছে, যার মূল দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, কোনো ধরনের অন্যায়, অসততা, অনিয়ম, আইন ভঙ্গ বা বেআইনি কাজ হচ্ছে কি না, তা মনিটর করা। ইন্সপেক্টর জেনারেলই হলেন ঐ অফিসের প্রধান এবং তিনি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন, যাদের অধিকাংশই আইনজ্ঞ বা আমলা। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরপ্রধান বা অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা খবরদারিমুক্ত। সাধারণ নাগরিক থেকে যে কোনো পর্যায়ের কর্মচারী বা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট এজেন্সির যে কোনো ধরনের ভুল কাজ, অনৈতিকতা, স্বজনপ্রীতি ও আইনভঙ্গের বিষয়ে ও আইজি অফিসে রিপোর্ট করলে, আইজি অফিস তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে বিচার বিভাগ ও ক্ষেত্রবিশেষে কংগ্রেসে প্রেরণ করে। রিপোর্টকারী ব্যক্তি বা কর্মচারীর চাকরির নিরাপত্তা ও প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সব ধরনের নিরাপত্তা আইন দ্বারা নিশ্চিত করা হয়। আইজি অফিস কেবল প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহি করে। অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেল অ্যাক্ট ১৯৭৮-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭২ জন ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্মরত।

দ্বিতীয়টি হলো হুইসেল ব্লোয়ার। ১৯৮৯ সালের হুইসেল ব্লোয়ার অ্যাক্টের মাধ্যমে তা আইনে রূপান্তর করা হয়। যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি এজেন্সির যে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যখনই সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বা কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কোনো ভুল কাজ, সিদ্ধান্ত, অন্যায়, আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে, জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, কংগ্রেস বা ওআইজি অফিসে নালিশ জানালে ঐ কর্মচারী বা কর্মকর্তাকে বলা হয় হুইসেল ব্লোয়ার। ফুটবল খেলার রেফারির মতোই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যিনি বাঁশির হুইসেল বাজান। সেই সঙ্গে ঐ নালিশকারী হুইসেল ব্লোয়ারের চাকরি এবং তার নিরাপত্তার সব দায়িত্ব এই আইনের আওতায় নিশ্চিত করা হয়, যাতে তার নালিশের কারণে প্রতিপক্ষ কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক হয়রানি বা অন্য কোনো ক্ষতি করতে না পারে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কংগ্রেসের দুটি অভিশংসন হিয়ারিংয়ে হুইসেল ব্লোয়ারদের দ্বারাই সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল।

তৃতীয় লাগামটি হলো ওম্বোসম্যান্ট বা ন্যায়পাল। স্টেট ও সিটি লেভেলে নিয়োগকৃত অম্বোসমেন্ট থাকলেও ফেডারেল সরকারে নির্দিষ্ট আইনাকারে তা রাখা হয়নি। তবে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদই এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। যে কোনো ধরনের অভিযোগ ও নালিশের ভিত্তিতে কংগ্রেস তাদের নিজস্ব হিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

সর্বশেষ ব্যাপক শক্তিশালী ও বিস্তৃত প্রতিষ্ঠানটির নাম হলো ওয়াচডগ। ঐতিহাসিক ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির ক্ষেত্রে প্রসিডেন্ট নিক্সনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা সেই কেলেঙ্কারির বিষয়টি সংবাদাকারে ছেপে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করেছিল।

শতাব্দীপ্রাচীন বিভিন্ন ধরনের পার্লামেন্টারি তথা কংগ্রেসনাল ওভারসাইট (মনিটরিং) কমিটির বাইরেও আধুনিক সাংবিধানিক ওয়াচডগ সৃষ্টি হয় মধ্য উনিশ শতকে কনট্রোালার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অফিস তৈরির মাধ্যমে। ১৯২৫ সালে প্রিভেনশন অব অ্যাবিউজ অ্যাক্টের অধীনে কংগ্রেশনাল মনিটরিং কমিটিগুলো কাজ শুরু করে। এই ওয়াচডগ হলো কোনো ব্যক্তি, গ্রুপ, কোনো প্রতিষ্ঠান, সংবাদপত্র, টিভি  বা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়া—যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য কোনো সংগঠন, ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের (সরকারি, বেসরকারি, বা কোনো ননপ্রফিট সংগঠনের) জনগণের পক্ষে কার্যক্রম মনিটর বা পর্যবেক্ষণ করে, কোনো বেআইনি বা অনৈতিক কাজ করে কি না, তা খতিয়ে দেখে।

লেখক : আইনজীবী