রাজধানীর উত্তরায় এটিএম বুথে ছুরি হামলায় ব্যবসায়ী নিহতের ঘটনায় সন্দেহভাজন তিন বন্ধু আত্মগোপনে। তাদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ। এমনকি এটিএম বুথে আসার জন্য ব্যবহৃত প্রাইভেট কারটিও খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ছিনতাইকারীর হাতে ব্যবসায়ী শরিফ উল্লাহ (৪৪) নিহত হওয়ার কথা বললেও তার স্বজনদের দাবি ভিন্ন।
নিহতের বড় ভাই আনোয়ার হোসেনের দাবি, শুধু ছিনতাই নয়, এর পেছনে অন্য কারণ রয়েছে। হত্যার আগে তার ভাই তিন বন্ধুর সঙ্গে প্রাইভেট কারে করে এটিএম বুথে এসেছিলেন। বুথের ভেতরে তার ভাই হত্যার শিকার হলেও ঐ তিন বন্ধু গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একটু পরে তারা প্রাইভেট কারে করে চলে যান। এ কারণে ঐ তিন বন্ধুর ভূমিকা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। ওই তিন বন্ধু হলেন মুস্তাফিজুর রহমান জুয়েল, মেহেদী হাসান ও শফিক। ঘটনার পর থেকে তারা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে পলাতক রয়েছেন।
গত ১১ আগস্ট দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ রোডের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা উত্তোলনের সময় আব্দুস সামাদ নামে এক ব্যক্তির ছুরি হামলায় উত্তরার টাইলস ব্যবসায়ী শরিফ উল্লাহ নিহত হন। ঐ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে আব্দুস সামাদকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার মোর্শেদ আলম বলেন, শরিফ উল্লাহর হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এখন পরিবার বলছে, এটি পরিকল্পিত হত্যা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এই হত্যায় নিহতের তিন বন্ধুকে সন্দেহ করা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে ডিসি মোর্শেদ আলম বলেন, ঘটনার পর থেকেই তাদের ডাকা হয়েছিল। কিন্তু তারা না এসে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে তারা ঘটনার পর আত্মগোপনে থাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না।
গত ১১ আগস্ট রাতের বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঐ দিন রাত ১০টা ৪০ মিনিটে ব্যবসায়ী শরিফ তার তিন বন্ধু জুয়েল, মেহেদি ও শফিকের সঙ্গে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ৪০, সোনারগাঁও জনপদ রোডের সাততলায় নেস্ট নামে একটি বারে যান। ঐ দিন রাত ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তারা বারে অবস্থান করেন। বার থেকে বের হওয়ার সময় লিফট বন্ধ থাকায় তারা সিঁড়ি দিয়ে নামেন। সেখান থেকে সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কারে ওঠেন তারা। রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে উত্তরার জনপদ মোড়ের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি বুথের সামনে প্রাইভেট কারটি থামে। গাড়ি থেকে শরিফ নেমে বুথে প্রবেশ করেন। এ সময় প্রাইভেট কারে অবস্থান করছিলেন জুয়েল, শফিক ও মেহেদী। টাকা ওঠানোর সময় একজন বুথের ভেতরে ঢুকে শরিফকে ছুরিকাঘাত করেন। ছুরিকাঘাত করা ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ার সময় আশপাশের লোকজন তাকে ধরে ফেলে।
সিসি ক্যামেরায় দেখা যায়, শরিফ গাড়ি থেকে নামার মিনিটখানেক পর জুয়েল গাড়ি থেকে নেমে আশপাশে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন। জুয়েল গাড়ি থেকে নামার মিনিটখানেক পর অপর দুই বন্ধু মেহেদী ও শফিক গাড়ি থেকে নেমে পায়চারি করছিলেন। ততক্ষণে (রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে) বুথের ভেতরে শরিফ লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের লোকজন ধাওয়া করে হামলাকারী আব্দুস সামাদকে আটক করে। এ সময় বন্ধু হয়েও ঐ তিনজন শরিফকে সাহায্য করা বা চিকিৎসার জন্য আশপাশের হাসপাতালে না নিয়েই প্রাইভেট কারে করে ঘটনাস্থল দ্রুত ত্যাগ করেন। পরে মামলার তদন্তের জন্য তাদের থানায় আসতে বলে পুলিশ। এরপর থেকেই তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ।
নিহত শরিফ উল্লাহর ভাই জাকির হোসেন জানান, ‘আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে খুনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে ভাড়াটে খুনি। কিন্তু পুলিশ “রহস্যজনক” কারণে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া তিন বন্ধুকে একবারও জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।’
মামলার বাদী নিহতের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, বন্ধুরা সবাই স্কুলজীবন থেকে ওঠাবসা। সবাই ৯৩ এসএসসি ব্যাচের। ছোটবেলার বন্ধু রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকবে আর তারা পালিয়ে যাবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। হয়তো কারো সঙ্গে শরিফের আর্থিক লেনদেন ছিল। এদের মধ্যে জুয়েল সুতা ব্যবসায়ী। ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক ঋণগ্রস্ত হন। তার বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার মামলাও আছে। শরিফের সঙ্গে তার গোপন আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে। শরিফকে যখন হত্যা করা হয়, তখন জুয়েলই এটিএম বুথের সামনে গিয়ে শরিফের রক্তমাখা শরীর দেখেন। তখন খুনিকে আটক না করে অথবা শরিফকে উদ্ধার না করে তারা ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন।
এ বিষয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, হত্যার পর হাতেনাতে ধরা পড়া আব্দুস সামাদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে নিহতের তিন বন্ধুকে আমরা খুঁজছি। তারা মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে গেছেন।