সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমন একটি নাম, যে নামটি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাস, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের গোটা সময়ের রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে যখন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলটির নাম পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ হয়, তার পরের বছরই সাজেদা চৌধুরী দলটিতে যোগ দেন। সেই থেকে আমৃত্যু তিনি আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন। জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব গোলাম আকবর চৌধুরীকে। গোলাম আকবর চৌধুরী ছিলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মতোই বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মানুষ। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী রাজনীতির পাশাপাশি একজন সংস্কৃতি সমঝদার ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন গভীর উপলব্ধির মধ্যদিয়ে। মায়ের প্রেরণাতেই হয়তো তার সন্তান সাজেদ আকবর হয়ে উঠেছেন একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। শিক্ষাজীবনে সাজেদা চৌধুরী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন।
সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগে যোগদানের পর থেকেই সুস্থ থাকতে কখনোই নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। সব আন্দোলন, সব সংকট মোকাবিলা করেছেন নির্ভয়ে, নিরবচ্ছিন্নভাবে। ১৯৬৯ সালের সেই উত্তাল আন্দোলনের সময় থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ডের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময়ে তিনি ১৯৭৪ সালে ইউনেসকোর ফেলোশিপ লাভ করেন এবং বাংলাদেশ গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সে সময় সর্বোচ্চ সিলভার এলিফ্যান্ট পদক লাভ করেন। তিনি ২০০ সালেও অ্যামেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউট কর্তৃক ‘ওম্যান অব দি ইয়ার’ নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যে পটপরিবর্তন হয়, তাতে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। তবে লক্ষণীয়, সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের সঙ্গে গামের মতো লেগেছিলেন! বলা যায়, আওয়ামী লীগকে উঠে দাঁড়াবার জন্য শক্ত হাতে ধরেছিলেন। ১৯৭৬ সালে সেই কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, সাজেদা চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালে পালিয়ে ভারত চলে যান এবং সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখান। তার সেই অবদানের জন্য ২০১০ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং জয় লাভ করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনেও জয় লাভ করেন। বর্ণাঢ্য জীবনে সাজেদা চৌধুরীর যেমন প্রাপ্তি আছে তেমনি বঞ্চনাও আছে। বছরের পর বছর তাকে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। রাস্তায় আন্দোলনে থাকতে হয়েছে, পুলিশের লাঠির আঘাতের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
১৯৯১ সালে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সাজেদা চৌধুরী ফরিদপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০০১৮ সালেও তিনি একই আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাজেদা চৌধুরী ছিলেন মিতভাষী এবং মানুষের সঙ্গে সদালাপী। তার পারিবারিক আবহ ছিল সংস্কৃতিবান্ধব। তিনি তার বংশ মর্যাদা বজায় রেখে চলেছেন। রাজনৈতিক নেতাদের নানা কারণে নানা দুর্নাম ঘাড়ে বহন করতে হয়। তার খানিকটা গুজবের কারণে আর খানিকটা নানাবিধ ঘটনার কারণে। এমন কোনো রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার সম্পর্কে সত্য অথবা অসত্য নানা কথা চালু নেই। এই বাতাস খানিকটা হলেও সাজেদা চৌধুরীর গায়েও লেগেছে। কিন্তু সেগুলো তিনি কখনো পাত্তা দেননি। পাত্তা দেওয়ার মতো কারণ বলেও মনে করেননি।
সাজেদা চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩৫ সালে মাগুড়ায়, তার মাতুতালয়ে। তার পিতা ছিলেন শাহ হামিদউল্লাহ এবং মা ছিলেন সৈয়দা আছিয়া খাতুন। তিনি মেয়ে এবং তিন পুত্র রেখে গেছেন। স্বামী আকবর চৌধুরী ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আর সাজেদা চৌধুরী তার বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে চলে গেলেন ১১ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের রাজনীতি সত্যিই তার কাছে ঋণী থাকবে। ভবিষ্যৎ ইতিহাসের পাতায় সাজেদা চৌধুরী নামটি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক