স্বাধীনতা, তোমার নামে কত কিছুই না হয়!

ফরাসি বিপ্লবোত্তর চরম অরাজকতা লক্ষ করে মনীষী মাদাম রোনাল্ড আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘Liberty, what crimes are being committed in thy name!’ (স্বাধীনতা, তোমার নামে কত অপরাধই না অনুষ্ঠিত হচ্ছে!)

আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পর মনীষীর উপর্যুক্ত উক্তিটি বেশ মনে ধরেছে। সত্যিই তো আমাদের বাংলাদেশেও ‘স্বাধীনতার’ নামে কত কিছুই না অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’ রূপে গড়তে চেয়েছিলেন জাতির পিতা। তাই সোনার মানুষ হতে বলেছিলেন সবাইকে। কিন্তু যে দেশপ্রেমিক ছাত্রযুবকরা এককাট্টা হয়ে স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন, সেই তারাই বিভক্ত হয়ে পড়লেন। কেউ বাংলাদেশ নামই স্বীকার করলেন না, কারো মুুখে ‘মুসলিম বাংলা’, কেউ বললেন, ‘পূর্ব বাংলা’, কেউ-বা ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’।

জাতি অবাধ ‘স্বাধীনতার’ কুফল হাড়ে হাড়ে টের পেল তিন বছরেই। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। পিতার হত্যাকে দেওয়া হলো রাষ্ট্রীয় বৈধতা, সমাজ-জীবনে নেমে এলো অবক্ষয়। স্বাধীনতার মূল্যবোধ, সংস্কৃতি—সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। নতুন কোনো মূল্যবোধও দুর্নিরীক্ষ্য—যে মূল্যবোধে স্বাস্থ্য ও শালীনতার লক্ষণ ছিল।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গুণমুগ্ধ নেতৃত্বের সুবাদে দেশে সরকারি উন্নয়নের চাঞ্চল্য সর্বত্র দেখা যায় সত্যি, কিন্তু তাকে প্রাণচাঞ্চল্য বলা যায় না। বরং এ যেন আমাদের মরণের আগে হাত-পা ছোড়া। কারণ বস্তুগত উন্নয়ন হলেও উন্নয়ন হয়নি রাজনীতির, দৃশ্যমান নয়, ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সম্ভাব্য দাবিদার দৃশ্যমান নয়। বরং দিন যত যাচ্ছে শঙ্কা তত ঘনীভূত হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজের ভূমিকাই-বা কী? এখন সংবাদপত্রেরও ছড়াছড়ি। রাজধানীর দেওয়ালগুলো আগেকার মতো রাজনৈতিক স্লোগানের চিকায় সাঁটানো নয়, তা এখন নামসর্বস্ব সংবাদপত্রগুলোর দখলে ঠাসা। প্রশ্নবিদ্ধ সাংবাদিকতার মান নিয়ে। প্রশ্ন সরকারের আচার-আচরণ নিয়েও। আজ দেশে, সমাজে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, সাহিত্যে ও সাংবাদিকতায়, শিক্ষাঙ্গনে, মন্ত্রণালয়ে যা যা ঘটছে, তা এই প্রজন্মের সাংবাদিকরা হজম করে নিচ্ছে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বা আবুল মনসুর আহমেদের মতো দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের আত্মপ্রকাশ ঘটলে এসব ঘটতে পারত না। আসলে তাদের স্থলবর্তী জন্মেনি।

‘সংবাদপত্রশিল্প আর দশটা সাধারণ শিল্পের মতো নয়, পণ্য তৈরি করিলেই বাজারে বিক্রয় হইয়া যায়; কিন্তু সংবাদপত্রকে জনমতের বাহন হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে হয়।’ সাংবাদিকতার পথিকৃত্ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। দেশে দেশে যুগে যুগে সংবাদপত্রের ওপর অসহিষ্ণু শাসকবর্গ হামলা করিয়াছেন; কিন্তু  শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রই জয়যুক্ত হয়েছে। যারা ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা উপেক্ষা করে সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় আচরণে লিপ্ত হয়েছিলেন, তাদের প্রতি তারা অনুকম্পা প্রকাশ করেছেন।

সত্যিই পুরুষসিংহ মানিক মিয়া শাসকদের অনুকম্পাই প্রদর্শন করতেন। তা নাহলে যে অর্ডিনান্সের খবরও সংবাদপত্রে ছাপানো নিষিদ্ধ ছিল, সেই তার বিরুদ্ধেই ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ বা ‘মুসাফির’ নামে কলাম কী করে লিখতেন? তিনি যুক্তির খড়গাঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারতেন মিথ্যাকে।

রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন যে ‘আমরা একবার সবাই মিলে জোর করে মানিক মিয়াকে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য করলাম। কিন্তু বছর না ঘুরতেই বললেন, ভেতরের চেয়ে বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের বেশি খেদমত করতে পারবেন। তিনি করেছেনও তা-ই। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, গোটা পাকিস্তানই তার কাছে ঋণী। তার অবদান এত মূল্যবান ছিল যে, ইচ্ছা করলেই মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের পদাধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু সেদিকে তার নজর ছিল না।

যেখানেই সাংবাদিকতার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন, সেখানেই মানিক মিয়ারা বেশি স্মরণীয়। ছয় দফার সমর্থনে মানিক মিয়া ও ইত্তেফাকের মতো সার্বিক ত্যাগ স্বীকার অতুলনীয়। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, ‘বস্তুত জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সাংবাদিকদের ত্যাগ ব্যাপকতায়, সামগ্রিকতায় ও মহিমা-মর্যাদা অপরিসীম। আমরা যারা সমানে জেল-জুলুম সয়েছি, তারা শুধু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে ভুগেছি। মানিক মিয়ার মতো সম্পত্তি ধ্বংস-বাজেয়াপ্ত হয়নি আর কোনো সাংবাদিক বা সম্পাদকের জীবনে।

যে গণদাবির সমর্থন করার অপরাধে ইত্তেফাক শাসকদের শ্যেনদৃষ্টির শিকার হয়েছিল, মাত্র তিন বছরেরই ছাত্রজনতার সংগ্রামের সামনে আইয়ুব শাহির পরাজয় ঘটে। ষড়যন্ত্রমূলক কুখ্যাত আগরতলা মামলারও অবসান ঘটে। যা ছিল ডিক্টেটর আইয়ুবের কুখ্যাত ‘সিভিল ওয়ার’ ও ‘আর্গুমেন্ট অব ওয়েপনের’ দর্প ও দম্ভের প্রথম নমুনা। রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদ লিখেছেন, ‘জালিমশাহির নমরুদি আক্রোশে যে বঙ্গবন্ধুকে পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে নির্যাতনের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল, সে আগুনের লক্-লকা জিভ ও উত্কীর্ণ স্ফুলিঙ্গ ইব্রাহিম নবির কুসুমস্তবকের সুষমা ও সৌরভ নিয়ে ‘ইত্তেফাকের’ ফুলাসন ও পুষ্পমাল্যে রূপান্তরিত হয়েছিল।’ সত্যিই দেশে সাংবাদিকদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার শক্তিধর ডিফেন্ডার হতে হলে পূর্বসূরি মানিক মিয়াদের জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষাগ্রহণের বিকল্প নেই।

রাষ্ট্র ও সংবাদমাধ্যম উভয়ের সমন্বয়ের প্রয়োজন, উভয়কে হাত ধরাধরি করে চলতে হবে। নিঃসন্দেহে সাহিত্য-শিল্পের ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদি, তার আবেদন ধীরসঞ্চারী, তার ফল দেখা দেয় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। তাত্ক্ষণিকের প্রয়োজন মেটাতে সংবাদমাধ্যম অদ্বিতীয়। সমাজের প্রতি দিনের চেহারাটা সংবাদমাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। প্রায় দর্পণের কাজ করে চেহারার কালো দাগটা সহজেই নজর কাড়ে, তখন তা মুছে ফেলার জন্য হাতটা ঊর্ধ্বাভিসারী না হয়ে পারে না। এ প্রায় জৈব তাড়নার মতো কাজ করে। কিন্তু অভাব সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিকের। যারা সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়কে পথ দেখাতে সক্ষম। সমাজ, রাষ্ট্র আর  জনগণের স্বার্থ যেখানে জড়িত—তা এমন বৃহত্ ও মহত্ বস্তু যে, তার জন্য সাংবাদিকরা নির্যাতনের মোকাবিলা করতে ভীত হতে পারেন না।

স্বাধীনতার আগে যে ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন সাংবাদিকরা হতেন, সেরকম পরিস্থিতি অবসান ঘটেছে। সরকার যারা চালান তারাও দোষে-গুণে মানুষ। তারাও যে মাঝেমধ্যে অসহিষ্ণু হয়ে ভ্রান্ত নীতির অনুসরণ করেন না, তা নয়। সাংবাদিকদের ফাঁসাতে সরকারকে কীভাবে আমলাতন্ত্র অসহিষ্ণু পথ বাতলে দিতে পারে, তা আমরা বিভিন্ন সময়ে কিছু ঘটনায় প্রত্যক্ষ করেছি। তার পরও সাংবাদিকদের বিপদের ঝুঁকি নিয়েই অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে হবে, সরকারের ভুলভ্রান্তিকেও দেখিয়ে দিতে হবে। তা না করা হলে শুধু যে সাংবাদিক হিসাবে কর্তব্যচ্যুতি ঘটে তা নয়, পেশার প্রতিও করা হয় বিশ্বাসঘাতকতা। দেশের মানুষকে সর্বপ্রকারে সচেতন করে তোলাই সংবাদমাধ্যমের বড় দায়িত্ব। এ দায়িত্বপালন রাজনীতিবিদদের দ্বারা হওয়ার নয়। কারণ তারা সব সময় সবকিছুই দলীয় চশমা দিয়ে দেখেন। তাই তাদের পক্ষে পুরোপুরি নিরপেক্ষ হওয়া বা যথাযথভাবে সবকিছু দেখা সম্ভব হয় না। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ঘটনাবলি সাধারণভাবে একটি প্রগতিপ্রবণ নির্দিষ্ট দিগন্তমুখী থাকার কারণে এবং মুক্তিসংগ্রামের ভাবাদর্শগত ও বস্তুগত উপাদানগুলো অনিবার্যভাবে স্বাধীনসত্তার দিকে বিন্যস্ত হওয়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকচক্রের মতো বাংলাদেশের সামরিক শাসকগোষ্ঠীও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে জুজু তৈরি করে, যা সংক্রমিত হয়েছে মানুষের মনে। নিষেধের বেড়াজাল ছিল চারদিকে। মাঝেমধ্যে এই ভয় আর বেড়াজাল ভাঙার জন্য দরকার পড়ে নির্ভীক মানুষের।

সাংবাদিকরা দার্শনিক নন, সমাজকে নতুন দর্শন দান করেন না বটে; কিন্তু চলতি সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের যা কিছু ক্লেদ, যা কিছু অনভিপ্রেত আবর্জনা, সেগুলো রাত্রির আঁধার হতে দিবালোকে তুলে ধরেন তারা। সমাজকে আঁধার ছেড়ে আলোর দিকে যেতে অনুপ্রাণিত করেন সাংবাদিকরা। আঁধারের দিকটা দেখিয়ে  দেওয়া মানে আলোর প্রতি আকৃষ্ট করা। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা সাংবাদিকরা যে পথে হাঁটছি তাতে আমাদের গণমাধ্যমগুলো ‘জলো’ হয়ে যাচ্ছে?

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক