কখনো পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ থেকে আসা দশাসই জ্যান্ত বড় গরু মরা, আবার কখনো বাছুর দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পার করে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গরু পাচারের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। ভারত সরকার হারিয়েছে কয়েক শ’ কোটি টাকার রাজস্ব। ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলের বেশ কয়েক জন নেতা। হয়েছে বহু টাকার লেনদেন। গ্রেফতার হয়েছেন ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কমান্ড্যান্ট সতীশ কুমার, তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলার সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল, তার গাড়ির চালকসহ ১২ জন। বিশাল এই পাচারের ব্যবসায় ভারতের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই খুঁজে পেয়েছে রাজনৈতিক যোগও।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে গরু পাচার চলছে বহু বছর ধরে। তবে ২০১৮ সালে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে। সেই তদন্তের সূত্র ধরে ২০২০ সালে গ্রেফতার করা হয় বিএসএফের কমান্ড্যান্ট সতীশ কুমারকে। আর তাকে জেরার পরই হাজার হাজার কোটি টাকার গরু পাচারের বিষয়টি নিয়ে রহস্যের জট খুলতে থাকে। দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব গরু সীমান্ত পার হয়ে পাচার হচ্ছে সেগুলোর বেশির ভাগই ট্রাকে চেপে আসছে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ থেকে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের গরু দুবলা, পাতলা। সেসব গরু ক্রেতাদের পছন্দের নয়।
- গরু আনে কারা?
তদন্তে সিবিআই জানতে পেরেছে, উত্তর ভারত থেকে বড় বড় গরু আনার এজেন্ট রয়েছে। তারাই হাজার হাজার গরু ট্রাকে করে নিয়ে আসে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলাসহ অন্য সীমান্তে। বীরভূমের ইলমবাজার, লাভপুরে বসে হাট। সেই সব হাটে গরু নিলাম করতে পারেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নির্দিষ্ট কিছু লোক। লাভের টাকা পর্যায়ক্রমে ভাগ পায় আরো কিছু লোক। নির্দিষ্ট স্ট্যাম্প মারা গরু সীমান্ত পারের জন্য যায়। এর জন্য নির্দিষ্ট সীমান্ত দিয়ে গরু পারাপার হয়। গরুপ্রতি সীমান্ত পারাপারের জন্য বিএসএফের কর্তাব্যক্তিদের দেওয়া হতো ২ হাজার টাকা।
- জড়িত কারা?
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, গরু পাচার কাণ্ডের তদন্তে নেমে প্রথমেই পাওয়া যায় এনামুল নামে এক ব্যক্তির কথা। জানতে পারেন অনুব্রত মণ্ডলের গাড়ির চালক সায়গলের হঠাৎ কোটি কোটি টাকার সম্পদের কথা। তাকে গ্রেফতার করা হয়। উঠে আসে অনুব্রত মণ্ডলের নাম। তাকে একাধিক বার জেরার জন্য ডাকা হলেও তিনি আসেননি। স্বাভাবিকভাবেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। জানা যায়, তার বিপুল সম্পদ, চালকল, জমিজমার কথা। মেলে তথ্য-প্রমাণও।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এই পাচারকাণ্ডে জড়িয়ে রয়েছে আরো বহু ব্যক্তি। কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি আর শুধু পাচারেই সীমাবদ্ধ নেই। এই পাচারের কারণে কারা সম্পদশালী হয়েছেন, সেটাও তদন্তের বিচার্য হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি তারা বলছেন, উত্তর ভারত থেকে আসা গরু পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পার হওয়ার মাঝে কয়েকবার হাত বদল হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রচুর দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা লুটে নেয় এমন অভিযোগও উঠেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, প্রতি বছর লাখ লাখ গরু সীমান্ত পাড়ি দেয়। এটা কয়েক জনের কাজ নয়। জড়িয়ে আছে বহু মানুষ। জড়িয়ে বিএসএফের কিছু সদস্যও। যার প্রমাণ বিএসএফের কমান্ড্যান্ট সতীশ কুমারের গ্রেফতার হওয়া