প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সহনশীলতা

পহেলা অক্টোবর ২০২২ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। প্রতি বছর নতুন নতুন থিম বা প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী ঘটা করে দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এ বছর ৩২তম।  জাতিসংঘ কর্তৃক এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Resilience of Older persons in a changing World’ বাংলায় যা বলা হয়েছে ‘পরিবর্তিত বিশ্বে প্রবীণ ব্যক্তির প্রতি সহনশীলতা।’ অর্থাত্ প্রবীণদের প্রতি সহনশীল হওয়া বা সহনশীল আচরণ করা সব নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব বা কর্তব্য। আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রবীণদের প্রতি এর ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন কারণে প্রবীণরা প্রতিনিয়ত অবহেলিত, নির্যাতিত এবং বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন।  

বাংলাদেশসহ বিশ্বে প্রবীণদের সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের উত্কর্ষসাধনের ফলে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে গেছে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে। ১৯২১ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ছিল যেখানে  ২০ বছর, বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৩ বছর। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগেরও বেশি প্রবীণ। অর্থাৎ প্রবীণের সংখ্যা ৮০ কোটিরও বেশি। বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব ব্যক্তিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতিমধ্যে সিনিয়র সিটিজেন বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ নাগরিক প্রবীণ। ২০২৫ সাল নাগাদ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০৫০ সালে হবে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। জনসংখ্যার বার্ধক্য আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা বলা যায়।

জাতিসংঘের তথ্যমতে বিশ্বব্যাপী প্রবীণরা দুর্ব্যবহার, অবহেলা, নির্যাতন এবং শোষণের সম্মুখীন হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। আমাদের সমাজে  অধিকাংশ প্রবীণই অত্যন্ত অবহেলিত ও নির্যাতিত। পরিবার ও সমাজে তারা অপাঙেক্তয়। অথচ দেশের উন্নয়ন তথা আজকের সমাজ ও সভ্যতার মূল কারিগর তারাই। একসময় যারা তাদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন, তারা প্রবীণ বয়সে অবহেলিত হবেন, বঞ্চনা, নির্যাতনের শিকার। তাই প্রবীণ ব্যক্তির পারিবারিক ও সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করা তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হলেও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণ বা উন্নয়নের জন্য গৃহীত কার্যক্রম তেমনভাবে  লক্ষণীয় নয়। দেশের অগ্রগতি, পরিকল্পনা বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম বলা যায় অনেকটাই উপেক্ষিত। প্রবীণরা পরিবার, সমাজ এবং এ দেশের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন। তাদের কর্মদক্ষতার ফলে আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। মধ্য-আয়ের দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি পর্যায়ে চলছে দেশ। কিন্তু তাদের সে অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। বর্তমান সরকার যদিও বয়স্কদের জন্য বয়স্কভাতা চালু, প্রবীণ নীতিমালা প্রণয়ন ও পিতামাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩ অনুমোদন করেছে কিন্তু প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য বার্ষিক বরাদ্দকৃত অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় একবারেই অপ্রতুল বা নগণ্য। প্রবীণ নীতিমালা ও পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ সালে অনুমোদন হলেও বিগত আট বছরেও এর বাস্তবায়ন নেই। তাছাড়া বয়স্কভাতার তালিকায় নিম্ন ও হতদরিদ্র শ্রেণির প্রবীণরা ছাড়া অন্যরা এর অন্তর্ভুক্ত না। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সত্ চাকরিজীবী শ্রেণিসহ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক প্রবীণ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র ক্রয় করেন তাদের জীবনের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের জন্য। কিন্তু সেই সঞ্চয়পত্রের মুনাফাও বেশ কয়েক বছর থেকে কেটে রাখা হচ্ছে। এ নিয়ে বহু আবেদন-নিবেদন  করেও

কোনো লাভ হচ্ছে না। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।  ফলে এই জনগোষ্ঠী পরিবার ও সমাজে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন। প্রবীণদের মেধা, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতাকে কোথাও কাজে লাগানো হচ্ছে না। দক্ষ এবং মেধাবী প্রবীণদের জন্য সরকারিভাবে কোনো কার্যক্রম গৃহীত হচ্ছে না। অনেক প্রবীণ ঘরে কর্মহীন জীবনযাপনের ফলে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ, অর্থনৈতিক অক্ষমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত করছেন। অথচ আজ থেকে ষাট বছর আগে এ  উপমহাদেশের বিশিষ্ট চিকিত্সাবিদ মেধাবী অধ্যাপক ডা. এ কে এম আবদুল ওয়াহেদ প্রবীণদের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণের কথা চিন্তা করে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য এইজেড অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব জেরিয়াট্রিক মেডিসিন’, যা পরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রায় এক একর জমির ওপর চারতলা একটি হাসপাতাল, ছয়তলাবিশিষ্ট একটি প্রবীণ নিবাস এবং চার বছর মেয়াদি জেরিয়াট্রিক প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য আইজিএম নামে একটি ইনস্টিটিউটসহ স্থাপন করেন ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’।  প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালে সকাল ও বিকালে বহির্বিভাগে রোগী দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রবীণ ছাড়াও সব বয়সি রোগীদের অভিজ্ঞ চিকিত্সক দ্বারা সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিত্সা সেবাসহ বিভিন্ন প্রকার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিবার ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবন্ধনভুক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বার্ষিক অনুদান পেয়ে থাকে। কিন্তু এই অনুদান প্রয়োজনের তুলনায় একবারেই কম। সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ৯২টি শাখা রয়েছে। শাখাসমূহের ও কেন্দ্রের জন্য স্বাস্থ্য ও সেবামূলক বহুবিধ কর্মকাণ্ড সম্পাদন ও পরিচালনায় বরাদ্দকৃত এ অর্থ একবারেই অপ্রতুল হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি তেমনভাবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এগিয়ে যেতে পারছে না। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, জেরিয়াট্রিক ইনস্টিটিউটটির কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও নিবাসটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নয়নের ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানের সদস্যসংখ্যাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশব্যাপী শাখার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এজন্য আগামী বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সরকারসহ সমাজের বিত্তবান ব্যক্তির সহযোগিতা ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত সব শ্রেণির কর্মকর্তা/কর্মচারীর আন্তরিক প্রচেষ্টা। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যেতে পারে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। বর্তমান প্রবীণবান্ধব সরকারের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আবেদন জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে হাসপাতাল, অফিস, আদালত, গণপরিবহনসহ সবখানে প্রবীণদের জন্য আসন সংরক্ষণ, বিভিন্ন রকম  সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি, স্বল্পমূল্যে টিকিট প্রদান, গণসচেতনতা সৃষ্টি, পাঠ্যবইয়ে প্রবীণদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে প্রবীণ নীতিমালা ও পিতামাতার ভরণপোষণ আইন যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২২-এ প্রবীণবান্ধব সরকারের কাছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই প্রত্যাশা।   

লেখক : অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান, আগারগাঁও, ঢাকা