জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চাকরিচ্যুত কর্মচারীর কাণ্ড

মামলার তদন্তে নেমে অঢেল অবৈধ সম্পদ মিললো বাদীর

মুজিবুর রহমান (৪০) জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেইনম্যান অর্থাৎ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। নানা অনিয়মের দায়ে ২০২০ সালের ২৩ জুন তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ঐ বছরের ১২ নভেম্বর মুজিবুর রহমানকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। এরপর থেকে তিনি প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন। এই কাজে তিনি নিজেকে কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবার রাজউক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছেন।

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হলেও মুজিবুর রহমান অঢেল সম্পদের মালিক। রাজধানীর হাতিরপুল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের পুকুরপাড়ে একটি অ্যাপার্টমেন্টে ফ্ল্যাট রয়েছে মুজিবুরের।  

ছবি- সংগৃহীত

তবে তিনি সপরিবারে ধানমন্ডির ১১/এ নম্বর রোডে ৭৭ নম্বর বাড়িতে বসবাস করেন। ঐ বাড়ির তৃতীয় তলায় ২/এ ফ্ল্যাট মালিক হিসাবে পরিচিত মুজিবুর। ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। যাতায়াতের জন্য তিনি দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। যার একটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-৩৬-৩০৩৯ এবং অপরটি হচ্ছে ঢাকা মেট্রো-গ-২৬-৪৪০৬। দুইটি গাড়ি টয়োটা এফ প্রিমিও। দুটি গাড়ির জন্য দুজন চালক রয়েছে। এছাড়া তার রিয়েল স্টেট ব্যবসাও রয়েছে। স্ত্রী মিসেস লাভলীর নামে খোলা কোম্পানির নাম ‘লাভলী রিয়েল স্টেট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার লিঃ’। মোহাম্মদিয়া সুপার মার্কেটের ৭৯/৮০ নম্বর দোকানে খোলা হয়েছে কোম্পানির অফিস। এছাড়া মুজিবুরের নামে-বেনামে একাধিক প্লট রয়েছে। বিভিন্ন জনকে পূর্বাচলে প্লট কিনে দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেননি। জমি দলিল করে না দেওয়ায় এক পর্যায়ে টাকা চাইলে উলটো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা জিডি ও মামলা করেন তিনি।

এরকম মুজিবুরের দায়ের করা একটি মামলা পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত করে সেটি মিথ্যা মামলা বলে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। ঐ তদন্ত প্রতিবেদনে মুজিবুরের বিরুদ্ধে এরকম অনেক অবৈধ সম্পদ থাকার কথা বলা হয়েছে।

ছবি- সংগৃহীত

গত ২২ ফেব্রুয়ারি মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় একটি ছিনতাই মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় জনৈক ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে। ঐ মামলা দায়েরের পর পুলিশ মোস্তাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। আদালত থেকে মোস্তাফিজুর রহমান ৩ মার্চ জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন। এরপর তিনি (মোস্তাফিজুর রহমান) আদালতের কাছে ঐ মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়ার আবেদন করেন। আদালত মুজিবুরের দায়ের করা মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইয়ের কাছে পাঠায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান মামলাটি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন।

পিবিআই

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদী ও বিবাদীর অঙ্গীকারনামার স্ট্যাম্প ২৪ ফেব্রুয়ারি ছিনতাই হয়। অথচ এ নিয়ে ১০ দিন আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি থানায় জিডি করেন মুজিবুর। ছিনতাইয়ের দুই দিন আগে ২২ ফেব্রুয়ারি মামলা করেন তিনি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে বা কোন দলিলের ভিত্তিতে এই মামলা রুজু হলো তা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া অঙ্গীকারনামা স্ট্যাম্পে উল্লেখ আছে যে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জমির প্লট রেজিস্ট্রি ও হস্তান্তর করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন মুজিবুর, অন্যথায় তিন মাসের মধ্যে পুরো টাকা এককালীন ফেরত দেবেন। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন মোস্তাফিজুর রহমান। যেখানে তিন মাসের কথা বলা হয়েছে, এর পাঁচ দিন আগেই ধানমন্ডি থানায় মামলা রুজু হয়। এটা অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক বলে প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই। এছাড়া ১৬ ও ২১ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন সময়ে মোস্তাফিজুরের মারধর ও হুমকি দেওয়ার যে অভিযোগ করেছেন মুজিবুর, তার সত্যতা পায়নি পিবিআই।

‘মামলায় নানা রকম অসংগতিসহ অঙ্গীকারনামা দলিলে অসম্পূর্ণ বিষয় থাকা সত্ত্বেও ধানমন্ডি থানার ওসির মামলা গ্রহণ করাটা একেবারেই সমীচীন বলে মনে হয়নি। এ ব্যাপারে ওসিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চিঠির মাধ্যমে আমার কাছে হাজির হওয়ার জন্য অনুরোধ করলে তিনি হাজির হননি’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান।

ছবি- সংগৃহীত

এ ব্যাপারে ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া বলেন, কেউ মামলা করতে চাইলে আইনগতভাবে পুলিশ নিতে বাধ্য। এ কারণে মামলা নিয়েছি। পরে পিবিআইয়ের তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মুজিবুর রহমান নামের একজন আমাকে পূর্বাচলে একটি প্লট কিনে দিতে চান। এরপর কয়েকটি কিস্তিতে ৩ কোটি ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেই মুজিবুরকে। এজন্য একটি অঙ্গীকারনামায় সই করি আমরা। পরে প্লট কিনে না দিয়ে মুজিবুর প্রতারণা করেন। টাকা চাইতে গেলে পরিবারসহ আমাকে হত্যার হুমকি দেন। এ নিয়ে মুজিবুরের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ নেয়নি। এরপর মুজিবুর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি থানায় আমার বিরুদ্ধে একটি জিডি করেন। জিডি করার এক সপ্তাহ পর ২২ ফেব্রুয়ারি মুজিবুর আমাকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলাও করেন। ঐ মামলাটি তদন্ত করার আগেই পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। পরে ৩ মার্চ জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন। পরে মামলা তদন্তে আদালতের মাধ্যমে পিবিআইয়ের সহযোগিতা চাই। এসব বিষয়ে জানতে মুজিবুর রহমানের মোবাইল ফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।