গ্রামের গরিব-অসহায় ছেলে মোসাহিদের বোন রোজিনা বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। কম সময়ের, কম ওজনের শিশুর জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা খরচ হবে—এ কথা ডাক্তার জানালে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। নিরুপায় হয়ে রোজিনাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে গেলে চার-পাঁচ ঘণ্টা ওয়ার্ডের বাইরে থাকতে হয়। ডাক্তার, নার্স সবাই হাসপাতালে সিট নেই বলে ক্লিনিকে ভর্তির পরামর্শ দেন। ডেলিভারির যন্ত্রণায় বোন ভাইয়ের সামনে মারা যাবে, তা সইতে পারেনি মোসাহিদ। তখন ভাই-বোনের কান্নায় হাসপাতালে আকাশ-বাতাস ভারী হয়েছিল। পায়ে-হাতে ধরে, কান্নাকাটি করে ভর্তি হয় ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ৭ নম্বর সিটে। কম ওজনের একটি কন্যাসন্তান জন্মদানের তিন দিন পর মা ও নবজাতকের সিট কেটে দেওয়া হয়। মোসাহিদের বাড়ি বিশ্বনাথ উপজেলার তেলিকোনা গ্রামে। ঘটনাটি গত ১৩ সেপ্টেম্বরের। শুধু রোজিনা নয়, এভাবে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত গরিব জটিল গর্ভবতী প্রসবকালীন যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে এসে চিকিত্সা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন, ক্লিনিকে বা বাড়িতে।
৬০-৭০ বছর আগেও গর্ভবতী নারীরা ছিলেন খুবই অবহেলিত। এক জন নারী ছয়-সাতটি, কেউ কেউ ১০-১২টি করে সন্তান জন্মদান করতেন। তখন এই ভূখণ্ডে চিকিত্সাব্যবস্থা না থাকায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু ছিল খুবই বেশি। যেমন ছিল জন্ম, তেমনি মৃত্যু। সে সময় চিকিত্সাব্যবস্থা বলতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছিল পানিপড়া, তাবিজ-কবজ, ঝাড়ফুঁক, গাছের লতাপাতার ওষুধ ইত্যাদি। ডেলিভারির চিকিত্সা করতেন কিছু অদক্ষ্য দাই ও তাবিজ-কবজের কবিরাজ। তারা গর্ভবতীদের তাবিজ ও পানিপড়া দিয়ে ডেলিভারি করাতেন। গর্ভবতীদের পোড়া মাটি (শিকড়) খাওয়ানো হতো। প্রসবকালীন মাটিতে, ময়লা-আবর্জনার ঘরে, খড়-লতাপাতা বা বাঁশের চটের ওপরে ডেলিভারি করানো হতো অন্ধকার ঘরে। নবজাতকের জন্মের পর মিষ্টি কথা বলার জন্য মধু, পানি, দুধ, চিনি খাওয়াতেন। নবজাতকের নাড়ি কাটা হতো বাঁশের টল, কাঁচি ও জীবাণুযুক্ত ময়লা ব্লেড দিয়ে। বাঁশ, শণ, খড়, লাকড়ি দিয়ে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে মা ও নবজাতককে তাপ দেওয়া হতো। এ ধরনের ধোঁয়ায় শিশুদের শ্বাসকষ্ট হতো। ধনুস্টংকারে আক্রান্ত শিশুদের জিন-ভূতের আশ্রয় মনে করে ঘরের দরজা-জানালায় কাঁটাযুক্ত একধরনের কুমারীলতা ও বড় বড় তাবিজকবজ বেঁধে রাখতেন। বলা হতো, ‘যে নারীর যত বেশি সন্তান মারা যাবে, সে সবার আগে বেহেশতে যাবে’। এই উপদেশ ছিল বেশি সন্তান জন্মদানের এক মহৌষধ বা মন্ত্র। এখন সেই অবস্থা নেই। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে চিকিত্সাবিজ্ঞানে বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার এক সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, প্রতি বছর গর্ভ জটিলতায় ৯০ হাজার শিশু মারা যায়। এর মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় ৭২ শতাংশ শিশু মারা যায় বাড়িতে প্রসবের কারণে। শিশুমৃত্যুর উচ্চহারের শীর্ষে ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম এখনো আছে। এজন্য প্রতিটি শিশুর জন্মের সময় মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সরকার হাসপাতালে স্ক্যানু (স্পেশাল কেয়ার নিউ বার্ন ইউনিট) সেবা চালু করায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু প্রসবকালীন মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু এই সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। মন্ত্রীর মতে, ১৯৭২ সালে শিশুমৃত্যু ছিল প্রতি হাজারে ১৪১ জন, এখন কমে হয়েছে ২১ জন। কিন্তু প্রসবকালীন মৃত্যু রোধ হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সব জেলা হাসপাতালকে ২৫০, উপজেলা হাসপাতালকে ৫০ শয্যা হাসপাতালে উন্নীত করেছে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সারা দেশে ১৩ হাজার ৮৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে। প্রতি ইউনিয়নে রয়েছে RD ও FWC। কিন্তু উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা ও গুণমান বৃদ্ধি না হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় অর্জিত হচ্ছে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও কোনো কাজে আসছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রথম দিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে এক-দুটি ডেলিভারি করে ব্যাপক প্রচারণা চলানো হয়েছিল। বর্তমানে অনেক অঞ্চলে এসব ক্লিনিক বন্ধ থাকে। কেবল ডেলিভারি নয়, সাধারণ চিকিত্সাও পাওয়া যায় না। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মাটিতে গর্ত করে নষ্ট করারও অভিযোগ আছে অনেক ক্লিনিকের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে ডেলিভারি ইউনিটের দরজাও খোলা হয় না। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাপটে চলে হাসপাতালগুলো। কারণ অধিকাংশ হাসপাতালে চিকিত্সক থাকেন অনুপস্থিত। প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে গর্ভবতীরা গেলে কাউকে পাওয়া যায় না। আয়া-পিয়নরা পরামর্শ দেন বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার জন্য। এতে সহায়সম্বল বিক্রি করে ৫০ হাজার থেকে লাখ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয় গরিব লোকদের।
জেলা হাসপাতালগুলোতে ডেলিভারি সেবায় জড়িতদের আচার-আচরণের কারণে মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পায়। অধিকাংশ চিকিত্সকের আচরণ অবাক হওয়ার মতো। সরকারি হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে সবার আচরণ রাজা-প্রজার মতো। একই ব্যক্তি প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গেলে মাতৃস্নেহের আচরণ লক্ষ করা যায়। এজন্য হয়তো এ দেশের কবি ও গায়কেরা বলেছেন, ‘এ দেশের রূপের নাইকো কোনো শেষ’। গ্রামের অবহেলিত মানুষ অনাহারে থাকতে পারে, কিন্তু খারাপ আচরণ সইতে পারে না।
গবেষকেরা বলছেন, বাল্যবিবাহ মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে বাল্যবিবাহ বেড়েছে। জরিপ বলছে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি দেড় কোটিরও বেশি মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশ কিশোরীর শিক্ষাজীবন বন্ধ। অশ্লীলতায় জড়িয়ে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ করে অপরিণত শিশুও জন্ম হয় ২১ শতাংশ। এদের গর্ভ খালাসের সময় মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে বেশি এবং মৃত্যু হলে অভিভাবকেরা গোপন রাখায় সব মৃত্যু হিসাবে আসে না।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন তৃণমূলের মাঠ কর্মচারী FWA, FWV ও FPI মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতি মাসে আটটি করে প্রায় ৩০ হাজার স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালনা করা হয়। এসব স্যাটেলাইটে মা-শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতীদের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা প্রদান করা হয়। শিশুর প্রতিষেধক টিকা এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুদের মায়ের শালদুধ, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, মিসোপ্রোস্টল ও বড়ি আপন খাওয়ানো এবং নবজাতকের নাড়িতে সংক্রমণ না হতে ৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ক্লোরহেক্সিডিন ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেন তারা। প্রতিটি FWCতে CSBA প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত FWA, FWV, FPI-দের সহায়তায় দেশে প্রতিদিন শত শত নরমাল ডেলিভারি করে সর্বত্র নজির স্থাপন করেছে। করোনার সময় অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ থাকলেও FWC-তে ডেলিভারি হয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা সরেজমিন তদন্ত করে মানবতার সেবায় পৃথিবীর কোনো জনগোষ্ঠীকে নোবেল পুরস্কার দিতে হলে তৃণমূলের এসব কর্মচারী নির্বাচিত হওয়ার দাবি রাখেন। কারণ গেল ৫০ বছরে সন্তান জন্মদানের হার ৬ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ১-এ কমিয়ে এনে বাংলাদেশকে জনবিস্ফোরণ ও মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
SDG বা টেকসই উন্নয়ন (২০১৬-২০৩০) সময়ে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সম্মত হয়েছে ১৯৩টি দেশ। এই সময়ে ৬৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। এমতাবস্থায় দেশের মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যু রোধের সঙ্গে জড়িত সব জনবলের আচরণ মানবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। হাসপাতালের যাবতীয় ওষুধ বিনা মূল্যে প্রদান, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাজের মনিটরিং জোরাদার, সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলো সক্রিয় করে প্রসবকালীন মৃত্যু রোধ করতে পারলে বিশ্বে বাংলাদেশ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সমাজ বিশ্লেষক