‘সত্য-মিথ্যার খেলার পরিণাম’ কী হবে

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন আলোর মুখ না দেখায় এবং সম্প্রতি তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে মস্কোর ইউক্রেনের ভূখণ্ড কবজা করার কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ যেভাবে নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে তাতে করে বলা যায়, পুতিনের হাতে থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এ অবস্থায়, যেহেতু পুতিনের সামনে বিকল্প দরজা খোলা নেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত-সজাগ থাকতে হবে।

গত বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পুতিনকে সতর্ক করে দিয়ে বাইডেন মন্তব্য করেন, ‘মস্কো যেভাবে ইউক্রেনে ক্রমাগতভাবে সামরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে তার ফলশ্রুতিতে পুতিন পারমাণবিকের পথে হাঁটলে রাশিয়া এবং তার জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন বিপদ’।

এ দিন নিউ ইয়র্কে ডেমোক্র্যাটিক তহবিল সংগ্রহের কাজে বের হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এক মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ‘কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর প্রথমবারের মতো আমাদের কাছে (রাশিয়ার পক্ষ থেকে) পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সরাসরি হুমকি এসেছে; বাস্তবিক অর্থে পরিস্থিতি যে পথে চলছে সেভাবেই চলতে থাকলে এই হুমকিকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ থাকবে না’।

তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি না যে, সত্য-মিথ্যার লড়াই শেষ না হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ব্যতিরেকেই কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সহজ সুযোগ পাবে কেউ (পুতিন)’।

প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে ‘সত্য-মিথ্যার খেলার চূড়ান্ত পরিণাম’ নিয়ে এ ধরনের অকপট মন্তব্য বিস্মিত করেছে সবাইকে, বিশেষ করে তহবিল সংগ্রহের মতো সময়ে, কেননা তার সহযোগীরা—জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্ট পর্যন্ত—বেশ ভেবেচিন্তে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, ‘আমরা হুমকিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিই। কিন্তু এখন পর্যন্ত ক্রেমলিনের কার্যক্রমে এমন কিছু দেখতে পাওয়া যায়নি যার কারণে তাতে খুব বেশি গুরুত্ব-মনোযোগ দিতে হবে’।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো প্রেসিডেন্ট বাইডেন কথা বলেছেন অতি সোজাসাপটাভাবে। তিনি বলেন, ‘আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি— পুতিনের জন্য রাস্তার শেষ প্রান্ত ঠিক কতদূর, তার হাতে আর ঠিক কী কী উপায় ও বিকল্প অবশিষ্ট আছে? বস্তুত শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাবেন যে তিনি মুখ লুকানোর জায়গা পাবেন না— উল্লেখযোগ্যভাবে নিজের ঘরের মধ্যেই তিনি শক্তি-গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে চরম বিপদে পড়বেন।’

ভ্লাদিমির পুতিন কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে এমন আশঙ্কাসহ সম্ভাব্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ও কী মাত্রায় প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা, জল্পনাকল্পনার শেষ নেই। এ নিয়ে গণমাধ্যমগুলোও সরব। তবে খোলসা করে কিছু বলছেন না মার্কিন কর্মকর্তারা, এমনকি বাইডেন প্রশাসনও বসে আছে মুখে কুলুপ এঁটে।

মার্কিন কর্মকর্তারা সম্প্রতি, বিশেষ করে বাইডেনের বৃহস্পতিবারের ঘোষণার পর, প্রশাসনকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘পুতিনের পারমাণবিক হামলা রুখতে কিংবা হামলা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নে যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।’ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন এই বলে যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন আলোর মুখ না দেখায় এবং সম্প্রতি তথাকথিত গণভোটের মাধ্যমে মস্কোর ইউক্রেনের ভূখণ্ড কবজা করার কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ যেভাবে নতুন নতুন মোড় নিচ্ছে তাতে করে বলা যায়, পুতিনের হাতে থাকা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। এ অবস্থায়, যেহেতু পুতিনের সামনে বিকল্প দরজা খোলা নেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত-সজাগ থাকতে হবে।

পেন্টাগনের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্যাট রাইডার সম্প্রতি বলেছেন, ‘পারমাণবিক শক্তি-ক্ষমতা প্রদর্শনের চিন্তা বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজের শামিল যদিও, তথাপি বেকায়দায় পড়ে নিরুপায় পুতিন এ পথে হাঁটলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।’ জেনারেল রাইডার এর আগেও বলেছিলেন, ‘যেমনটা আমি আগে উল্লেখ করেছি—কঠিন পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কৌশলগত প্রতিরোধের ধরন কী হবে সে সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই; বরং আমরা মনে করি না যে প্রেসিডেন্ট পুতিন এই সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাইডেনের মন্তব্যের পর পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য জানতে চাওয়া হলে মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনকে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, রাশিয়ার পারমাণবিক অবস্থানে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখেননি তারা।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ষাটের দশকের পর বিশ্ব সবচেয়ে কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে তথা আজকের বিশ্ব পারমাণবিক সংকটের খুব কাছাকাছি—প্রেসিডেন্ট বাইডেন এই সতর্কতা উচ্চারণ করছেন যদিও, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা রাশিয়ার পারমাণবিক অবস্থানের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন লক্ষ করিনি।’ একই ধরনের কথা উঠে এসেছে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি কারিন জিন-পিয়েরের গত মঙ্গলবারের বিবৃতিতে। বিবৃতি থেকে জানা যায়, রাশিয়ার গতিবিধি পরিবর্তনের তেমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বিধায় যুক্তরাষ্ট্রের আচরণেও কোনো পরিবর্তন নেই।

একইভাবে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মার্কিন সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়ার কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো কিছু নেই, রাশিয়ার আচরণেও পারমাণবিক হামলার সুস্পষ্ট লক্ষণ নেই।’ ঐ কর্মকর্তা মনে করেন, যদিও রাশিয়ার পারমাণবিক গতিবিধির মধ্যে এমন কিছু নেই যাকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে; তথাপি তহবিল সংগ্রহের মতো সময়ে প্রেসিডেন্ট যে ভাষায় কথা বলেছেন তাতে করে ধরে নেওয়া যায়, সরকার কিংবা প্রশাসন জুড়ে কর্মকর্তাদের অনেকটাই গাছাড়া ভাব!

‘এখন অবধি এমন কিছুই শনাক্ত করা যায়নি যাকে পারমাণবিক সংঘাতকে প্রতিফলিত করতে পারে বলে ধরে নেওয়া যায়’—একজন কর্মকর্তা মনে করছেন এ রকমটাই। বাইডেনের মন্তব্য যখন সবার মধ্যে শোরগোল সৃষ্টি করে চলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এ ধরনের নানা কথা শোনা যাচ্ছে অনেকের মুখেই।

বাইডেনকে খুব কাছ থেকে দেখা ও তার চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত একজন ব্যক্তি সিএনএনকে বলেছেন, ‘তহবিল সংগ্রহে গিয়ে বাইডেন স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, রাশিয়ার আচরণের মধ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট হুমকির আলামত খুঁজে পান বলেই তিনি মনে করেন।’ এমতাবস্থায়, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের ক্রমাগত প্রকাশ্য হুমকির বিষয়কে মার্কিন কর্মকর্তারা শক্তভাবেই দেখছেন বলে মনে করাটাই যুক্তিসংগত। পুতিনের আক্রমণাত্মক কথাবার্তা এবং রুশ সেনাবাহিনীর আগ্রাসি মনোভাবের প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি রয়েছে বলে ধরে নেওয়াটাই বাস্তবসম্মত চিন্তা হবে।

গত মাসের শেষের দিকে এক টেলিভিশন ভাষণে পুতিন বলেছিলেন, ‘যদি রাশিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়ে তবে সেক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে রাশিয়া এবং দেশের জনগণকে রক্ষা করার জন্য যাবতীয় উপায় প্রয়োগ করব আমরা। এই কথা নিছক ধাপ্পাবাজি নয়।’ তাছাড়া অতি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল—দোনেত্স্ক, লুহানস্ক, জাপোরিঝিয়া, খেরসনকে অবৈধভাবে রাশিয়ারা সঙ্গে সংযুক্ত করার ঘোষণা দেওয়ার সময় পুতিন বলেছেন, ‘রাশিয়া এই অঞ্চলগুলোকে রক্ষা করার জন্য সম্ভাব্য সব পথে হাঁটবে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিনরা পারমাণবিক হামলার মাধ্যমে ‘নজির সৃষ্টি করে’ উল্লেখ করে পুতিন তার ঘোষণায় যোগ করেন, ‘যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মেকাবিলা করতে রাশিয়া তার সাধ্যের সবটুকু করবে।’

ভ্লাদিমির পুতিনের বক্তব্য যখন এই, তখন থেমে থাকেনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের মুখও। বাইডেন বলেছেন, ‘এমন একজন ব্যক্তি আছে যার সম্পর্কে আমি-আমরা ভালোভাবেই জানি, তাকে বেশ ভালোমতোই চিনি। যখন তিনি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা জৈবিক বা রাসায়নিক অস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে কথা বলেন তখন তিনি রসিকতা করেন না মোটেই! এর কারণ অজানা নয় কারো—তার সামরিক বাহিনী মুখ থুবড়ে পড়েছে, তার প্রতিটি কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং সর্বোপরি তিনি খেলার মাঠে ঠিক কায়দা করে উঠতে পারছেন না।’ সত্যিকার অর্থেই প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এই মন্তব্যের মধ্যে অনেক ‘না বলা কথা’ নিহিত রয়েছে।

লেখকদ্বয়: সাংবাদিক

সিএনএন থেকে ভাষান্তর :সুমৃত্ খান সুজন