জৈবিক আলো : প্রকৃতির টর্চলাইট

বাংলাদেশে বাঁশ ঝোপঝাড়ে বা জঙ্গলে আঁধাররাতে যারা বিচরণ করেছেন, তারা হয়তো লক্ষ করে থাকবেন, এর কোনো কোনো স্থান সুপ্রভ আলোকচ্ছটায় আঁধারের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। বর্ষণমুখর রাতে বা ঝোড়ো হাওয়ার ছোঁয়ায় এই আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে ওঠে। যারা কুসংস্কারে বিশ্বাসী, তারা এটাকে ভূতের আলো বলে আখ্যা দিয়ে এটা থেকে দূরে সরে থাকার উপদেশ দেন, অনেকে অকারণে ভয়ে শিউরে ওঠেন, অশুভ আশঙ্কায় ফকির সন্ন্যাসীর দ্বারস্থ হন।

এ ধরনের একটা মজার বাস্তব অভিজ্ঞতা আমার ছাত্রজীবনে ঘটেছে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারস ক্লাসের ছাত্র। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকি। আমার বাল্যবন্ধু উসমান গণি জানায়, তাদের বাড়ির বনছায়াপথে একটি জায়গা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে। এই দিনই রাতে আমার চাচাতো ভাই মতিকে নিয়ে সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, স্যাঁতসেঁতে জঙ্গলময় রাস্তার পাশে ঘাসে আবৃত কিছুটা স্থান খুবই উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। এটি এত আলোময় ছিল যে, অমবস্যার রাতের এ অন্ধকারেই এ আলোতে আমরা পরস্পরের চেহারা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাই। হাত দিয়ে জায়গাটুকু ধরে কোনো তাপ অনুভূত হলো না। আলোটা স্নিগ্ধ অথচ উজ্জ্বল। একটু মাটি খুঁড়ে একটি শিকড় পেলাম। টান দিতে এটি ভেঙে মাটিতে উঠে এলো। একটু বাঁকা, হাত দুয়েক লম্বা। এটি টেনে ওপরে তুলে আমরা দেখে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। মনে হলো, একটি সাদা উজ্জ্বল টিউব লাইট জ্বলছে। বাড়ি ফিরে কালো পলিথিন দিয়ে শিকড়টি পেঁচিয়ে নিয়ে ঢাকা চলে এলাম। এমএসসি ক্লাসে তখন আমি রেডিয়েশন বায়োলজি (Radiation Biology) পড়ছি। মনে হলো, এই শিকড় থেকে তেজষ্ক্রিয় রশ্মিও বিচ্ছুরণ ঘটছে। সোজা চলে গেলাম রেডিয়েশন বায়োলজির প্রফেসর ড. আবু তৈয়ব স্যারের বাসায়। তিনি দেখে বললেন, রেডিয়েশন হতে পারে। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনে নিয়ে পরীক্ষা করার উপদেশ দিলেন। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-সংলগ্ন ছিল। কমিশনের চিফ কেমিস্ট শিকড়টি পরীক্ষা করে দেখলেন এবং Geiger Muller Counter বা তেজষ্ক্রিয়তা পরিমাপ যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করেন। এতে তেজষ্ক্রিয়তা ধরা পড়ল না। একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলাম, এটিতে পানি দিলে আরো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে। শিকড়টি আলো দেওয়া অবস্থায় আরো মাসছয়েক ছিল। এরপর দেখা যায়, শিকড়টির আলো দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে গেল। কেবল এ দেশেই নয়, এ রহস্যময় আলোকবর্তিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে বিস্ময়াভিভূত করেছে। রাশিয়ার এক সম্রাট ছিলেন। তার বিস্ময়কর এক বাগানবাড়ি ছিল। তথায় আপেলগাছে সোনার আপেল ফল ধরত। হঠাত্ দেখা গেল, বাগান থেকে প্রতি রাতেই সোনার আপেল চুরি হচ্ছে। রাজা এই চুরির কথা শুনে রাগেদুঃখে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন এবং ছোট রাজকুমারকে চোর ধরার দায়িত্ব দেন। রাজকুমার সারা রাত জেগে বাগান পাহারা দেন; কিন্তু কোনো চোর দেখতে পেলেন না। একদিন মধ্যরাতে লক্ষ করেন যে, বাগানে অন্ধকারে আলোর ঝলকানি এবং আপেলগাছের ডালে একটি আগুনের পাখি বসে আছে এবং একটি আপেল ছিড়ে নিচ্ছে। রাজকুমার পাখিটিকে লক্ষ্য করে তির ছোড়েন। তির পাখির গায়ে লাগলে পাখি উড়ে যায়, তবে একটি পালক পড়ে যায়। পালকটি এত আলোকিত ছিল যে, এর আলোতে বাগান আলোকিত হয়ে গেল।

এটি রূপকথার গল্প হলেও কেউ কেউ জানে যে, আসলে গল্পের আগুনে পাখি কিন্তু বাস্তবে আছে। এ ধরনের আলো ছড়ানো পাখি কেউ কেউ হয়তো দেখে থাকবেন। আর সাগরতীরে রাতে যারা ভ্রমণ করেন, তারা কেউ কেউ হয়তো অন্ধকারে হঠাত্ আলোর ঝলকানিসহ রাজহংসকে ডানা ঝাপটাতে দেখে থাকবেন। এ রহস্যের সমাধান মিলে বেশ পরে। কমপক্ষে অন্তত এক প্রজন্মের বিজ্ঞানীগণ এই রহস্য ভেদ করতে না পেরে অবাক বিস্ময়ে আলোকোজ্জ্বল এই ঘটনা অবলোকন করেছেন। মাত্র শত বছর আগে বিজ্ঞানীরা এ রহস্যোদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। 

প্রকৃতিতে কিছু অণুজীব (microrganism) আছে, যারা শরীরের ভেতরে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় আলো উত্পাদন করতে পারে। প্রকৃতিতে কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীরও এই গুণ রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান এ ধরনের ১ হাজার ১০০ প্রজাতিরও বেশি প্রাণীর সন্ধান পেয়েছে। জীবদেহে আলো উত্পাদন ও বিচ্ছুরণ প্রক্রিয়াকে বায়োলুমিনেসসেন্স (Bioluminescence) বলা হয়।

বেশির ভাগ আলো বিচ্ছুরণকারী প্রাণী ও উদ্ভিদ সাগরে বাস করে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো সাগরের উপরিস্থলে এক ক্ষুদ্র উদ্ভিদ পেরিডিনিয়ান (Peridinians) তবে ঢেউবিহীন শান্ত সাগরে এগুলো আলো বিচ্ছুরণ করে না। যখন কোনো জাহাজের চলাচলে ঢেউ সৃষ্টি হয়, তখন ঢেউয়ের মাথায় এগুলো জ্বলে ওঠে। এজন্য রাতের বেলা জাহাজের চলার পশ্চাতের ঢেউ অত্যুজ্জ্বল দেখা যায়। কোনো ডুবুরি যদি সাগরে পেরিডিয়ান সমৃদ্ধ এলাকায় বিচরণ করে, তবে চলাচলের দরুন পেরিডিয়ানদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত এবং এগুলো আলো বিচ্ছুরণ করে। ডুবুরি এতে শত শত রকমারি আলোর দুর্লভ ঝলকানি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে। 

বিভিন্ন অণুজীব এবং ছত্রাকে বায়োলুমিনসেন্স দেখা যায়। গাছের কোঠরে বা মরা গাছের অংশে একধরনের আলো উত্পাদী ছত্রাক বাস করে। গাছের কোঠরে প্যাঁচা, ইগল বা অন্যান্য পাখি বাসা বাঁধে। এতে কিছু ছত্রাক তাদের গায়ে লেগে থাকে। যখন পাখি উড়ে যায় তখন এগুলোই আলো বিচ্ছুরণ করে। রাতের অন্ধকারে তাই তাদের আলোকিত দেখায়। সাগরের পাড়ে বসবাসকারী হাঁসজাতীয় পাখির পালকে সাগরের আলো বিচ্ছুরণকারী অণুজীব লেগে গেলে তাদেরও আলোকিত দেখায়। এজন্য উড়ন্ত অবস্থায় কিছু সামুদ্রিক পাখির পাখায় আলোর ঝলকানি দেখা যায়।

আমেরিকার দুপাশে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলীয় এলাকায় একধরনের ছোট (২৫-৩০ সে. মি. দীর্ঘ) সিংগিং ফিশ (Singing Fish) রয়েছে। এই মাছগুলোর সারা শরীরে অসংখ্য ছোট ছোট দানার স্পট লাইট রয়েছে। এগুলো দ্বারা তারা আলো বিচ্ছুরণ করতে পারে। কিছু স্কুইড (Edible Squid) এবং সাগরের আরো কিছু প্রাণী তাদের বিশেষ অঙ্গকে আলোকবর্তিকা হিসেবে ব্যবহার করে। আলোকবর্তিকাগুলো বেশ বড় এবং শরীরের সম্মুখভাগে চোখের ওপর বা চোখের সামনে অবস্থিত। তারা এগুলোকে টর্চলাইটের মতো ব্যবহার করে। আমাদের দেশে জোনাকি পোকা রাতের অন্ধকারে বনজঙ্গলে আলোর মেলা সৃষ্টি করে। মূলত পুরুষ জোনাকি পোকা স্ত্রী জোনাকিকে আকর্ষণ করার জন্যই মিটমিট করে আলো জ্বেলে থাকে। 

লেখক : সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব, সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন