অর্ধ শতাব্দী আগে ইসরায়েল এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘ইয়ম কিপুর যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়। মিশর ও সিরিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইসরায়েলের মধ্যে ১৯৭৩ সালের ৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সংঘটিত ইয়ম কিপুর যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে তাত্পর্যপূর্ণ এ জন্য যে, এর পটভূমিকায় দাঁড়িয়েই তেল উত্পাদনকারী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভোক্তা দেশগুলোসহ প্রায় গোটা বিশ্বের গড়ে ওঠে নতুন সমীকরণ। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরব পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা পশ্চিমা দেশগুলোতে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তাদের অভিযোগ-অজুহাত, ইসরায়েলকে সমর্থন দেয় পশ্চিমারা। বিশ্বব্যাপী এটাই ছিল তেলের প্রথম ধাক্কা। গত বুধবার, ইয়োম কিপুর তথা ইহুদিদের পবিত্র দিনে, সৌদি আরব এবং দেশটির তেল মিত্ররা—যারা বর্তমানে ওপেক প্লাস (ওপেক+) গ্রুপে রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, বিশ্বের শক্তি ব্যবস্থাকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে! উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোট। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ২ শতাংশ হ্রাস পাবে, যাকে খালি চোখে খুব একটা বড় ধাক্কা মনে না হলেও বৃহত্ পরিসরে এর বিরূপ প্রভাব মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো!
মনে রাখতে হবে, সম্প্রতি বিশ্বে ব্রেন্ট ক্রুডের (অপরিশোধিত তেল) দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা এর স্বাভাবিক মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ। ঠিক এমন একটি অবস্থায় তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি ডেকে আনবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এর বাজে প্রভাব পড়বে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানির ঘাটতি ও বাড়তি দাম এমনিতেই বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ক্রমশ বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। কাজেই নতুন করে তেল সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ করে দিলে দেশগুলোর মধ্যে তিক্ততা বাড়বে। সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া দেশগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বাড়বে ভোক্তা দেশগুলোর। খোলসা করে বলতে গেলে, এর মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের সম্পর্ক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ বেকায়দায় পড়ে যাবে। জেদ্দায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাত্র আড়াই মাস না যেতেই সৌদি আরবের তরফ থেকে এ ধরনের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত’ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জন্য ‘কপালে চিন্তার ভাঁজ’ ফেলার শামিল। কেননা আসছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর বাকি আছে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। এ রকম একটা কঠিন মুহূর্তে তেল সরবরাহ কমে যাওয়া বাইডেনের জন্য নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অস্বস্তিদায়ক। ‘যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ যেন বিঘ্নিত না হয়’—এই দাবি নিয়ে দিন কয়েক আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন হোয়াইট হাউজের দূত-কর্মকর্তারা। তাদের অনুরোধ রক্ষা করা হয়নি। বরং এর পরিবর্তে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদের সত্ ভাই সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান সরবরাহ কমানোর চুক্তি চূড়ান্ত করেছিলেন! অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার হেলফারস্টরফারস্ট্রাসে অবস্থিত ওপেক সদর দপ্তরে সরবরাহ কমানো সংক্রান্ত চুক্তিটিতে যখন তিনি চূড়ান্ত সিল মারেন সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া এই রুশ কর্মকর্তার ‘যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ বন্ধের চুক্তি কার্যকরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা’ যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি সম্পর্ক কিংবা বৃহৎ পরিসরে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মোটেই কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটি ইনসাইটের অভিজ্ঞ ওপেক পর্যবেক্ষক রজার দিওয়ান বলেছেন, ‘তেল উৎপাদন বা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া তেল অস্ত্রায়নের শামিল’। একে ইচ্ছাকৃত ঘটনা হিসেবে অভিহিত করে দিওয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চুক্তির সময় রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার বিষয় কিংবা আসন্ন শীতকে সামনে রেখে তেল সরবরাহ সীমিত-কঠোর করার বিষয়ে চুক্তি করার মানে হলো, রাশিয়া ইতিমধ্যেই ইউরোপে তার গ্যাস রপ্তানিকে অস্ত্র বানিয়েছে’। দিওয়ানের মতে, সৌদি আরবের এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষের জন্য জ্বালানি ঝুঁকিকে আরো প্রসারিত করে তোলাটা সহজ করে দেবে’। এমতাবস্থায় দিওয়ান মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি যুদ্ধ এবং ৯/১১ হামলার মতো ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ‘শক্তি-নিরাপত্তা জোটের অংশ’ হিসাবে সামরিক সহায়তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যথেষ্ট নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরবের এই নতুন আত্মবিশ্বাস থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দেশটি নিজেকে মুক্ত কিংবা শক্তিশালী মনে করছে! এমনকি আমেরিকাকে চাপের মধ্যে রাখার পাশাপাশি নিজস্ব বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক স্বার্থে কাজ করতে উদ্যত হয়েছে সৌদি আরব। আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বাইডেন প্রশাসন সরবরাহ না কমানোর বিষয়ে জোটকে আহ্বান জানিয়েছিলেন যদিও; তথাপি প্রেসিডেন্টের আহ্বানকে উপেক্ষা করা হয়েছে যা ওয়াশিংটনকে হতবাক করেছে। এসব প্রত্যক্ষ করে প্রেসিডেন্ট বাইডেন যারপরনাই ‘হতাশ’ এবং সরবরাহ বাড়ানোর জন্য ‘বিকল্প’ খুঁজছেন তিনি। হোয়াইট হাউজ ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে, ওপেক রাশিয়ার সঙ্গে একত্রিত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষেই সাম্প্রতিক সময়ে ওপেক এবং পশ্চিমা তেল আমদানিকারক দেশগুলো সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে। এর কারণ হলো, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তাতে করে বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোকে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করার কথা ভাবছে। অর্থাৎ, দেশগুলোর জন্য যা একটি পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা, বিপরীতক্রমে তা তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর জন্য জীবিকার ওপর আক্রমণ। বাস্তবিক অর্থেই এ এক জটিল সমীকরণ!
নির্বাচনের আগে প্রচার-প্রচারণার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি তেলের ব্যবহার কমানোর ব্যবস্থা করবেন। আবার জামাল খাসোগিকে নির্মমভাবে হত্যার জন্য সৌদি আরবকে একটি ‘ন্যক্কারজনক ছোট জাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন তিনি। এ রকম নানা বিষয় মার্কিন-সৌদি সম্পর্কে যে ফাটল সৃষ্টি করেছিল সৌদির তেল সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত তাকে আরো গভীরে নিয়ে গেল।
ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন বিশ্ব জ্বালানির সমস্ত হিসাবনিকাশকে উলোটপালট করে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এখন সরল যুক্তিতে দাবি করা যায়, তেলের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য কী কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হবে? কিংবা এই প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে, জ্বালানি শক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ কোন পথে চলেছে?
ভুলে গেলে চলবে না, বাইডেন প্রশাসনের ‘তেল থেকে সরে আসা’ ও একটি নতুন ক্লিন এনার্জি যুগের সূচনা করার প্রতিশ্রুতিকে ভালো চোখে দেখেনি তেল উত্পাদনকারী দেশগুলো। এমনকি ওপেকের পক্ষ থেকে অভিযোগ আছে, ভোক্তা দেশগুলো বরাবরই চেষ্টা করে এসেছে যে, কীভাবে তেলের দাম কমতির দিকে রাখা যায়। ওপেক সরাসরি অভিযোগ করে আসছে, ওয়াশিংটন তার বাজারে হস্তক্ষেপ করতে চেষ্টা চালায়। যেমন ওপেকের দাবি—ওপেককে দাম কমাতে বাধ্য করার জন্য গত বছর যুক্তরাষ্ট্র জরুরি তেলের মজুত থেকে অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়া শুরু করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই বাইডেন প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত ভালো লাগেনি ওপেক সদস্যদের। তারা বেশ বিরক্ত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের এই কাজে।
যাহোক যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগের জবাবে সৌদি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, ‘আমরা কোনোভাবেই রাশিয়ার ইশারায় কাজ করছি না, বরং নিজেদের এবং বৃহত্তর গোষ্ঠীর স্বার্থ অনুসরণ করছি আমরা’। বস্তুত সৌদি আরব ‘যুবরাজ মোহাম্মদের রাজত্বের আধুনিকীকরণের একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছে রিয়াদ। একজন সিনিয়র সৌদি কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা রিয়াদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছি। আমরা ওপেক প্লাস এবং নিজেদেরকে সমর্থন করছি। এর ফলে রাশিয়ার জন্য সুবিধা হচ্ছে বটে, কিন্তু মনে রাখতে হবে—আমরা কোনো দাতব্য সংগঠন নই’।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে সৌদির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা আশা করছি, ওয়াশিংটনে কড়া প্রতিক্রিয়া শিগিগরই বন্ধ হবে। আমরা এ-ও আশা করি, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এই সংকটময় সময় কেটে যাবে। বাস্তবিক অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আট দশক ধরে চলে আসা কৌশলগত সম্পর্ক আছে তা স্বাভাবিকই থাকবে’।
সৌদির এমন বক্তব্য সত্ত্বেও সমালোচকরা বলছেন নানা কথা। ডান্ডি ইউনিভার্সিটির শক্তি, পরিবেশ এবং সমাজ বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক পল স্টিভেনস বলেছেন, ‘রাশিয়াকে সমর্থন করতে পেরে তারা বেশ খুশি, যদিও একে পুরোপুরি অস্বীকার করবে তারা’। টাফ্স ইউনিভার্সিটির ফ্লেচার স্কুলের ক্লাইমেট পলিসি ল্যাবের অধ্যাপক অ্যামি মায়ার্স জাফ বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যখন শঙ্কা তৈরি হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে উচ্চমূল্য খোঁজার সিদ্ধান্ত কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়’। ‘উৎপাদন কমানোর জন্য রাশিয়ার অনুরোধকে সমর্থন করার মাধ্যমে ওপেক নিজেকে এমন এক ভূমিকায় দাঁড় করিয়েছে যা তার নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনবে’—এই মন্তব্যও করেছেন জাফ।
অন্যদিকে অনেকেই যুক্তি দেখাচ্ছেন, তেলের বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত তথা জীবাশ্ম থেকে সরে আসা পাকাপোক্ত হতে পারে। এর ফলে জ্বালানিব্যবস্থার স্থানান্তর ত্বরান্বিত হবে। ওপেকের সাম্প্রতিক ক্রিয়াকলাপ এই প্রক্রিয়ায় কফিনে শেষ পেরেক হয়ে উঠলেও অবাক হওয়ার মতো কিছুই থাকবে না।
লেখকদ্বয় :জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক
যুক্তরাজ্যের দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস থেকে ঈষত্ সংক্ষেপিত অনুবাদ :সুমৃৎ খান সুজন