আরো ভয়ংকর বিপদের মুখোমুখি হবেন পুতিন

ক্রিমিয়া ব্রিজে হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। ক্রিমিয়া ও রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করা কার্চ ব্রিজ নামে পরিচিত এই রুশ স্থাপনায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে গত শনিবার। এই বিস্ফোরণে সড়ক ও রেলসেতুর অংশবিশেষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—রাশিয়ার ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলোর হিসাবমতে, বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩২ থেকে ৮০ লাখ ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হামলার জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করেছেন স্বভাবতই; যদিও এর দায় স্বীকার করেননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউক্রেনের মাটিতে মুহুর্মুহু বোমা ছোড়া হয়েছে। হামলা ও পালটা হামলা, আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বিশেষ করে কার্চ ব্রিজে বিস্ফোরণে পর, একটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে—রুশ সেনাদের কঠিন বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মূলত ‘পুতিনের নেওয়া একের পর এক ভুল ও বাজে সিদ্ধান্ত’।

কার্চ ব্রিজে হামলার ঘটনার মাধ্যমে দক্ষিণ ইউক্রেনে রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলসমূহে পুতিনের কৌশলগত ব্যবস্থার বাস্তবতার আঁচ পাওয়া যায়। গত কয়েক সপ্তাহে এই এলাকায় পুতিন বাহিনীর অবস্থান প্রকৃতপক্ষে খুব একটা ভালো নয়। তাদের পশ্চাত্পসরণতাই চোখে পড়বে কেবল। এবং এই অবস্থার মধ্যেই কার্চ ব্রিজে হামলার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, ক্রিমিয়া ও খেরসন অভিমুখের মূল রেলপথ, যা কিনা রাশিয়ার সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম, আক্রমণের প্রশ্নে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ!

রুশ গণমাধ্যম মারফত জানা গেছে, রাশিয়ান কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘শনিবার সন্ধ্যার মধ্যেই সেতুর সড়কপথের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের মধ্য দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয় এবং সেতুর রেলপথে যথারীতি চালু হয় ট্রেন পরিষেবা। যদিও ট্রাকগুলোকে ফেরি পারাপারের সাহায্য নিতে হয়।’ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, হামলা বা কোনো কারণে ক্রিমিয়া কিংবা ইউক্রেনে যুদ্ধরত রুশ সেনাদের সামরিক সরঞ্জাম বা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর চালান পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়লে তা বেকায়দায় ফেলবে পুতিন বাহিনীকে। এমনকি এই মুহূর্তে ফেরি পারাপারও বেশ বিপজ্জনক। এক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রতিকূল অবস্থায় উপনীত হলে রিকেটি ফেরি ক্রসিং কিংবা অত্যন্ত বিপজ্জনক এয়ার কার্গো ফ্লাইট ব্যবহারে বাধ্য হবে রাশিয়া। অর্থাৎ, কার্চ ব্রীজকে ঝুঁকিমুক্ত করতে না পারলে খারাপ সময়ে তা অন্যান্য ব্রিজের ওপর চাপ বাড়িয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। 

বাস্তবিক অর্থেই একটি বিষয় রুশ সেনাদের, এমনকি ক্ষমতার বড়াই করা পুতিনকে বেশ ভোগাচ্ছে—সেটি হলো রেলপথ! দখলের প্রশ্নেই হোক কিংবা দখল টিকিয়ে রাখতেই হোক, রেলপথের গুরুত্ব হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন পুতিন। অন্যদিকে এই সুযোগ লুফে নিয়েছেন ইউক্রেনের যোদ্ধারা। খুব ধীরগতিতে এবং ঠান্ডা মাথায় আক্রমণ করে চলেছে জেলেনস্কির ইউক্রেন। রেলপথে রুশ বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা প্রথমেই গুঁড়িয়ে দেয় ইজুম, যা খারকিভে রুশ সেনাদের পতনকে সুগম করেছিল। তারপরে লাইমান, যা দোনেত্স্ক ও লুহানস্কে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলছে। এবং সর্বশেষ কার্চ ব্রিজ, যা দক্ষিণকে ধরে রাখতে রাশিয়ার মরিয়া চেষ্টাকে ধূলিসাৎ করে দিলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।  

শনিবারের ঘটনা পুতিনের জন্য সমস্যাকে আরো বেশি জটিল করে তুলেছে এ জন্য যে, দোনেস্কর অভ্যন্তরে রাশিয়ার যে রেল হাব রয়েছে, তা-ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। রেল হাব হিসেবে খ্যাত ইলোভাইস্কের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, রেলের ধমনি প্রবাহিত হওয়া এই অঞ্চল আক্রমণ-হামলায় ক্ষতবিক্ষত। কার্চ ব্রিজের ঘটনার পর ইলোভাইস্কেও একটি কার্গো ট্রেন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রেলপথে ঘটা এসব হামলা প্রবল চাপের মধ্যে ফেলেছে পুতিনকে।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুযোগ বুঝে মোক্ষম সময়ে হামলা চালানোর জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকছে ইউক্রেন। অতর্কিত হামলার মাধ্যমে পুতিনকে চাপে রাখতে ধৈর্য নিয়ে অপক্ষো করছেন জেলেনস্কি—ঠিক যখন পুতিনের কোনো দুর্বলতা সামনে আসছে, ঝাঁপিয়ে পড়ছেন ইউক্রেনের যোদ্ধারা। লক্ষ করলে দেখা যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কোনো আঘাত আসেনি, যতক্ষণ না গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উঠেছে রুশ বাহিনী। 

বলা বাহুল্য, কার্চ ব্রিজে হামলার ঘটনার পর পুতিন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ধীরগতিতে ঘটলেও ক্রমাগত পরাজয়ের মুখে পড়ে তার অহংকার মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দিনিপ্রো নদীর পশ্চিমে খেরসন অঞ্চলে তার সেনাবাহিনী যেভাবে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে, তাতে চিন্তা বাড়ছে এই রুশ স্বৈরশাসকের। ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে এই অঞ্চল কবজা করা বসে থাকা রুশ বাহিনী কার্যত অবরুদ্ধ। পশ্চাত্পসরণ অবধারিত হয়ে উঠেছে তাদের জন্য। কার্চ বিস্ফোরণের সূত্র ধরে এই অঞ্চলে জেলেনস্কি বাহিনীর আত্মবিশ্বাসের মুখে মুখ থুবড়ে পড়বে পুতিন বাহিনী।

দিনিপ্রো অঞ্চল জুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে ওঠা সেতুগুলো যারপরনাই ভোগাচ্ছে রাশিয়ান বাহিনীকে। কার্চ ব্রিজ কিংবা নতুন করে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে চরম অসহায় হয়ে পড়বে রুশ সৈন্যরা। ইতিমধ্যে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানেই ৫০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে গেছে তাদের। এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নড়বড়ে সরবরাহ রুটের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আধিপত্য ধরে রাখা পুতিনের জন্য অসম্ভব বৈকি। এরূপ অনিশ্চিত পরিস্থিতি ক্রেমলিনের সামনে দুটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—পশ্চাত্পসরণ, নাকি নতুন করে বাজি ধরা?

দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অবধারিতভাবে পুতিনের সামনে আসবে ‘ক্রিমিয়া ইস্যু’। মনে রাখতে হবে, ২০১৮ সালে কার্চ প্রণালিতে নির্মিত কার্চ ব্রিজটি নিজে ট্রাক চালিয়ে উদ্বোধন করেছিলেন পুতিন। ব্রিজটি রাশিয়ার সঙ্গে ক্রিমিয়ার যোগাযোগের এতটাই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম যে, বলা হয়ে থাকে সেতুটি পুতিনের মুকুটের কোহিনূর হিরা! কিন্তু সেই কহিনূরই এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল পুতিনের জন্য। বিষয়টি ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে অবৈধভাবে দখল করতে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ক্রেমলিনের মিথ্যা অহংকার ও সাম্রাজ্যবাদের আড়ম্বর বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে। ধুঁকতে থাকা সেনাবাহিনীকে নতুন করে শক্তিশালী করার কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছেন পুতিন। ঠিক এমন একটি অবস্থায় তিনি যদি যুদ্ধরত সেনাদের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে তা তো নিশ্চিতভাবেই এক মহাবিপদ। 

২০০০ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুতিনের মুখে কখনো দুর্বলতার ছাপ দেখা যায়নি। কাজেই এই পর্যায়ে এসে ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়াটা তার জন্য স্বাভাবিকভাবেই বেশ কঠিন এবং তিনি অবশ্যই এর জন্য প্রস্তুত নন। এক্ষেত্রে জুয়া খেলার মতো বাজি ধরা ছাড়া তার সামনে সহজ পথ  খোলা নেই। সে পথেই নিরুপায় পুতিন ক্রমাগতভাবে হেঁটে চলেছেন। যদিও এই পথ থেকে তার সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কেননা, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি যা, তাতে করে বলা যায়, তার শাসনক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে যাবে; অথবা তিনি বিজয় পেলেও তা হবে খুব ছোট আকারের। এ রকম বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে তিনি পারমাণবিক হুমকি দিয়ে ভাঁওতাবাজির পটভূমি রচনা করতে উদ্যত হয়েছেন, যার ফল হবে খুবই ভয়ংকর।

মস্কোর পুরোনা ধাঁচের পরিবহনব্যবস্থার বিপরীতে কিয়েভের স্মার্ট ও ধীরস্থির আক্রমণ পুতিনকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। গত সাত মাসের পরিসংখ্যান সে কথাই বলছে। যেভাবে একের পর এক কুপোকাত হয়েছে পুতিন বাহিনী, তাতে করে বেশ ভালোই ধরাশায়ী হয়ে উঠেছেন পুতিন। পুতিনের ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হলো ‘কার্চ বিস্ফোরণ’। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতে পারে—এর মাধ্যমে পুতিন কি তার মিথ্যা অহমিকার রাস্তা থেকে ফিরে আসবেন, নাকি পরিকল্পনাকে নতুন করে ঢেলে সাজিয়ে যুদ্ধে বিজয়ী হতে আরো বেশি মরিয়া হয়ে উঠবেন?  

লেখক :সিএনএনের ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি এডিটর 
সিএনএন থেকে অনুবাদ :সুমৃৎ খান সুজন