শুধু আসামি নয়, ভিকটিমের পরিবারেরও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে

একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ ফটোসাংবাদিক আফতাব আহমেদ হত্যা মামলায় পাঁচ আসামির ফাঁসি বহাল রাখার জন্য হাইকোর্টে আবেদন জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ.এম আমিন উদ্দিন। ডেথ রেফারেন্সের শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি আদালতে বলেন, শুধু আসামি পক্ষই যে ন্যায় বিচার পাবে তা নয়, ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদেরও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। 

মঙ্গলবার (১১ অক্টোবর) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল এ কথা বলেন। পরে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগমীকাল বুধবার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রেখেছেন আদালত।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আফতাব আহমেদ একজন প্রবীণ নাগরিক। তিনি বিশ্বাস করেই হুমায়ুন কবিরকে গাড়ির চালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। অথচ সেই চালকই খুনি ভাড়া করে তাকে মেরে ফেলেছে। আর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কিভাবে সংঘটিত হয়েছে তার পূর্ণ বিবরণ উঠে এসেছে তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। সেই জবানবন্দিতে আসামিরা বলেছেন যে তারা গামছা দিয়ে হাত-পা বেঁধে গলায় ‘সাদা তোয়ালে’ পেঁচিয়ে আফতাব আহমেদকে হত্যা করেন। এই সাদা তোয়ালে এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এছাড়া আসামিরা একে অপরকে জড়িয়ে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদালতে দিয়েছেন সেটাও সঙ্গতিপূর্ণ। এছাড়া লাশের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, জব্দকৃত আলামত ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে আফতার আহমেদের গাড়ি চালকের পরিকল্পনায়। এই চালকই মূল অপরাধী। এছাড়া মামলার অপর আসামিদের বিরুদ্ধেও আরও ডাকাতির মামলা রয়েছে। অতএব কোন আসামি যদি সাজা হ্রাসের প্রার্থনা জানায় সেটাও বিবেচনা করা আদালতের উচিত হবে না।

সুপ্রিম কোর্ট

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাহেরকে হত্যার পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন করেন তারই সহকর্মী অধ্যাপক মিয়া মো. মহিউদ্দিন। সেই মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম। সেই জবানবন্দিতে পুরো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অধ্যাপক মহিউদ্দিন খুনিদের চাকরি, কম্পিউটার ও অর্থের লোভ দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটন করেন। এই আসামিদের জবানবন্দির ভিত্তিতেই মহিউদ্দিনের ফাঁসি বহাল রেখেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না থাকলে ফাঁসি বহাল রাখা যায় সেটা আপিল বিভাগের এই রায়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।

চাপ প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে আসামি পক্ষের কৌসুলিদের এমন বক্তব্যের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই অভিযোগ তো এই মামলায় প্রমাণ হয়নি। আসামি পক্ষও তো সেটা আদালতে প্রমাণ করতে পারেনি। আমি মনে করি আসামিরা যে জবানবন্দি দিয়েছেন সেখানে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ধারাবাহিকতা রয়েছে। কোথাও এই ধারাবাকিতায় ছেদ ঘটেনি। এ কারণে ট্রাইব্যুনাল পাঁচ আসামিকে যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন তা বহাল রাখার আবেদন জানাচ্ছি। কারণ ভিকটিমের পরিবারেরও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

আফতাব আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

ফাঁসির আসামি হাবিব হাওলাদারের পক্ষে আইনজীবী হেলাল উদ্দিন মোল্লা বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডকে মিস গাইড (ভিন্নখাতে) প্রবাহিত করেছে। একটির সঙ্গে আরেকটির কোন যোগসূত্র নাই। গাড়ি চালক হিসাবে যে হুমায়ুন কবিরকে সাজা দেওয়া হয়েছে তিনি আসল হুমায়ুন নন। আমরা আদালতের কাছে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করছি।

বিল্লাল হোসেন কিসলুর আইনজীবী ফজলুল হক খান ফরিদ বলেন, আমার আসামিকে পটুয়াখালী থেকে র‌্যাব পরিচয়ে ধরে আনা হয়েছে। এ নিয়ে তার স্ত্রী সাধারণ ডায়েরিও করেন। দীর্ঘদিন বেআইনিভাবে হেফাজতে রেখে তার জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই হুমায়ুন কবিরই প্রকৃত অপরাধী ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী। সাক্ষীদের সাক্ষ্য, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিচার-বিশ্লেষণ করেই ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির রায় দিয়েছে। এছাড়া বিল্লাল হোসেন কিসলুকে যে র‌্যাব পরিচয়ে ধরে আনার অভিযোগ করা হয়েছে সেটাও প্রমাণিত কোন বিষয় নয়। কারণ যে সাধারণ ডায়েরি উনার স্ত্রী করেছিলেন সেটার কোন তদন্তের ফল আদালতে আসেনি। ফলে এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়।

সুপ্রিম কোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সামিরা তারানুম রাবেয়া মিতি শুনানি করেন। সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তামান্না ফেরদৌস ও ফারজানা শম্পা। হুমায়ুন কবিরের পক্ষে এসএম শাহজাহান, পলাতক রাসেল ও রাজুর পক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি শফিকুল ইসলাম শুনানি করেন।

২০১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর রামপুরার নিজ বাসা থেকে দৈনিক ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক আফতাব আহমেদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় করা মামলায় ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিচারক আবদুর রহমান সরদার। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামি হলেন-বিল্লাল হোসেন কিসলু, হাবিব হাওলাদার, রাজু মুন্সি, রাসেল এবং গাড়িচালক হুমায়ুন কবির মোল্লা। অপর আসামি সবুজ খানকে সাত বছর কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। রাজু মুন্সি ও রাসেল পলাতক রয়েছেন। পরে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি আসামিরা আপিল করেন।

সাংবাদিক আফতাব আহমেদ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রবীণ ফটোসাংবাদিক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে অনেক দুর্লভ ছবি তোলেন। আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য ২০০৬ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।