মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বাড়বে ২ হাজার টাকা
আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী (মাসিক ভাতা) ২ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁদের উত্সব ভাতা (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) ১০ হাজার টাকা, নববর্ষ ভাতা (পয়লা বৈশাখ) ২ হাজার টাকা এবং বিজয় দিবস ভাতা (১৬ ডিসেম্বর) ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে, যা আগামী বাজেটেও অপরিবর্তিত থাকবে।
নদীভাঙন-কবলিত এলাকায় পুনর্বাসনে কোটি টাকা বরাদ্দ
সাম্প্রতিক কালে নদীভাঙনে বসতবাড়ি, জনপদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার প্রভৃতি বিলীন হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে। নদীভাঙন-কবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের পুনর্বাসনের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন এবং জলবায়ু সহনীয় স্মার্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে ৫১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, সেচসুবিধা সম্প্রসারণের জন্য ৪ হাজার ৮৮৩ কিলোমিটার সেচ খাল খনন ও পুনঃখনন এবং ২০০টি সেচ স্ট্রাকচার নির্মাণ ও মেরামত করা হবে। এ ছাড়া তিনটি ব্যারাজ ও রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হবে। বন্যা ও লবণাক্ততা-জলাবন্ধতা হ্রাসের জন্য ২৫০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণসহ নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান
আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের অবসান ঘটানো হবে বলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একদিকে শ্রমবাজারে বিপুল কর্মক্ষম জনশক্তির আগমন, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছে এবং এর সমাধানে নানাবিধ পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার শিল্প খাতে কর্মসৃজনের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আধুনিকায়ন, শ্রমিকের সুরক্ষা জোরদার করা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিক হারে কর্ম প্রবেশ উপযোগী আইন-বিধি, নীতি-কৌশল সংস্কারের জন্য তিন বছর মেয়াদে কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের অবসান ঘটানো হবে।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৫.১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব
অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় জানান, মিরসরাই, সোনাগাজী ও সীতাকুণ্ড উপজেলার ৩০ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরকে দেশের সর্ববৃহত্ পরিকল্পিত ও আধুনিক শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে এ পর্যন্ত ১৫.১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে। দেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হচ্ছে।
সুনীল অর্থনীতিতে জিডিপি বাড়বে ২ শতাংশ
বাংলাদেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার সম্ভাবনাময় সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে জিডিপির ২ শতাংশ বৃদ্ধি সম্ভব। বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতের রায়ে সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রের একচ্ছত্র অধিকার লাভ করে, যা আরো একটি বাংলাদেশের প্রায় সমপরিমাণ। বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে ১৩টিরও বেশি ভারী খনিজ পদার্থ। রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, সামুদ্রিক শৈবাল। সম্ভাবনাময় এ সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জিডিপির ২ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। বিপুল সম্ভাবনাময় এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত কৌশলগুলো হলো, সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা, উপকূলীয় জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো, সমুদ্রবন্দর আধুনিকায়ন, সমুদ্রে ইকোটুরিজম, ব্যক্তিগত নৌবিহার কার্যক্রম চালু করা।
সম্রাট মেইজিকে অনুসরণের সময় এসেছে
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জাপানের মেইজি সম্রাটের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আঠারো শতকের শেষার্ধে মেইজি পুনর্গঠন শুরুর আগে জাপান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের পশ্চাত্পদ দেশ। সম্রাট মেইজি জাপানিজদের এমনকি রাজপুত্রকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে পাঠিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও প্রযুক্তিজ্ঞান আহরণ করার তাগিদ দেন। সম্রাট মেইজি বুঝতে পারেন জাপানে ছাত্রের অভাব নেই। কিন্তু অভাব হচ্ছে উপযুক্ত শিক্ষকের। তাই তিনি পাশ্চাত্য দেশসমূহ থেকে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষিত কয়েক হাজার শিক্ষককে জাপানে নিয়ে এলেন। এর ফলে জাপান শুধু পশ্চিমাদের সমকক্ষ হয়েই থাকেনি বরং সারাবিশ্বে সকলের আগে প্রথম শতভাগ শিক্ষিতের দেশ হওয়ার গৌরব লাভ করে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘আমরা মনে করি সম্রাট মেইজিকে অনুসরণ করার সময় আমাদেরও এসেছে। প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষার সর্বস্তরে আমাদের উপযুক্ত এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের কাছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে হস্তান্তর করতে চাই।’
সুদমুক্ত ক্ষুদ্র্রঋণ খাতে বরাদ্দ সাড়ে ৬৪ কোটি : দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে আগামী অর্থবছরে ৬৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অতি দরিদ্ররা এ সুবিধা পাবেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পল্লী সমাজসেবা (আরএসএস) কার্যক্রম, পল্লী মাতৃকেন্দ্র (আরএমসি) কার্যক্রম, দগ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন কার্যক্রম, শহর সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম নামে চারটি সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা হারে সুদমু্ক্ত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের ক্ষেত্রে শতকরা ৫০ ভাগ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
ফুটবলের উন্নয়নে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ : বাজেটে ফুটবলের উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অনুকূলে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গবাদি পশুর জন্য বিমা চালুর পরিকল্পনা : গবাদি পশুর জন্য বিমা চালুর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি উল্লেখ করেন, সরকার গবাদি পশুর জন্য বিমা চালু করা, দরিদ্র নারীদের ক্ষুদ্র বিমার আওতায় আনার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করা এবং সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর পরিকল্পনা করেছে। বিমা খাতে ডিজিটালাইজেশন ও এর পেনিট্রেশন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। এ থেকে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি হতে কৃষকদের রক্ষার্থে ‘শস্যবিমা’ একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হবে। এ ছাড়া বৃহত্ প্রকল্পের মাধ্যমে সৃষ্ট সম্পদের বিমা দেশীয় বিমা কোম্পানির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে একাধিক কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিমা সম্পাদনের ব্যবস্থা করা হবে। লস অব প্রফিটের জন্য বিমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারখানা শ্রমিকদের জন্য দুর্ঘটনাজনিত বিমা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ছে : বাজেটে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে। এ খাতে গত অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৫০ কোটি ৩ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে ৬৭ কোটি ১০ লাখ টাকা।