২০৩০ সাল নাগাদ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর কথা থাকলেও প্রতি বছর দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ব দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ট্রমা ইনজুরিতে আহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাথা ও স্পাইনাল কর্ড বা মেরুদন্ডে আঘাতপ্রাপ্ত। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পঙ্গুত্বের হারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। নেই প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ। তবে সচেতনতা সৃষ্টি ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অভিমত দিয়েছেন।
আজ ১৭ অক্টোবর বিশ্ব ট্রমা দিবস। ট্রমা বলতে শরীরে সৃষ্ট কোনো আঘাত ও মানসিকভাবে বিপর্যয় অবস্থাকে বোঝায়। সড়ক দুর্ঘটনা, আগুন লাগা, পুড়ে যাওয়া, গাছ বা উঁচু ভবন থেকে পড়ে আঘাত পাওয়া, নারীদের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ, শিশু ও বৃদ্ধসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ, এসব নানাবিধ কারণে ট্রমা হতে পারে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সচেতনতা তৈরিতে এ দিবসটি পালন করা হয়। সাধারণত হঠাৎ কোনো শারীরিক ও মানসিক আঘাত পেলে মানুষ ট্রমায় যায়। দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য হলো ট্রমা ইনজুরি কমিয়ে আনা। ২০১১ সালে প্রথমে ভারতে ট্রমা দিবস পালন করা হয়। ২০২১ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশে দিবসটি পালন শুরু হয়।
সাম্প্রতিককালে ট্রমার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা। অনেক আঘাত অস্থায়ী বা স্থায়ী অক্ষমতা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দুর্ঘটনায় নিহত হয় এবং আহত হয় ৫ কোটির বেশি মানুষ। আহতদের অধিকাংশেরই পঙ্গুত্ব বহন করছে।
দেশে ট্রমা ইনজুরিতে মৃত্যুর প্রধান কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। আর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাগুলো মূলত ঘটে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিংয়ের চেষ্টা, বারবার লেন পরিবর্তন, ট্রাফিক আইন না মানা ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলার কারণে। হেলমেট ব্যবহার না করা ও নিম্নমানের হেলমেটের কারণে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। মোটরবাইক দুর্ঘটনার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ দশমিক ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এতে মৃত্যু ৫১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩১ লাখের বেশি, যা মোট যানবাহনের ৬৮ শতাংশ। শুধু ঢাকাতেই নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ৮ লাখের মতো। এর বাইরে একটি বড় অংশের মোটরসাইকেল অনিবন্ধিত। বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ নতুন মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। দেশের তরুন প্রজন্ম ও চাকরিজীবীরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন।
ট্রমা ইনজুরির চিকিৎসা ব্যয়বহুল। অনেকের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব না। যেহেতু ট্রমাটিক ইনজুরি আকস্মিক শারীরিক আঘাত, এর জন্য দ্রুত চিকিত্সার প্রয়োজন। দেশে গত এক বছরে ট্রমায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তা সে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ বা রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে হোক না কেন।
সড়ক দুর্ঘটনাকে বিশ্বজুড়ে আঘাতজনিত অভিজ্ঞতার অন্যতম সাধারণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে ৬২৮৪ জন নিহত হয়েছেন, ৭ হাজার ৪৬৮ জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে ৯২৭ জন মহিলা এবং ৭৩৪ জন শিশু। এই সময়ে ৭৬ টি নৌদুর্ঘটনায় ১৫৯ জন মারা গেছেন, ১৯২ জন আহত হয়েছেন এবং ৪৭ জন নিখোঁজ হয়েছে। ২০২১ সালে ১২৩ টি রেল দুর্ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল্লাহ আলমগীর বলেছেন, যারা ট্রমায় ভুগছেন তাদের নিরাময়ে সমর্থন দিতে হবে। ট্রমা একটি গুরুতর সমস্যা। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ট্রমা দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের জীবনে একটি পার্থক্য আনা যায়। সাবধানে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ম মেনে চলার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, গাড়ি চালানোর সময় সতর্কতা চিহ্ন এবং ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মোটর সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পরতে হবে। রাস্তায় চলাকালীন মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে। উচ্চস্বরে গান বাজানো এড়িয়ে চলুন। দীর্ঘ একটানা গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ছোট বিরতি নিন। বাচ্চাদের বৈদ্যুতিক সুইচ এবং তার, ধারালো জিনিস এবং ওষুধ থেকে দূরে রাখতে হবে। বাড়িতে এবং গাড়িতে সর্বদা একটি প্রাথমিক চিকিৎসা সুরক্ষা কিট রাখুন। বাড়ির সিঁড়ি, জানালা, বারান্দা এবং ছাদ নিরাপদ কিনা খেয়াল রাখতে হবে। ক্লান্ত, নিদ্রাহীন বা মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাবেন না। গাড়ি চালানোর সময় কোনো ঝুঁকি নেবেন না, যদি আপনার তাড়া থাকে। বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি পরিচালনা করবেন না। মাথা বা মেরুদন্ডের আঘাতের ক্ষেত্রে, কোনও পেশাদারের সাহায্য ছাড়া দুর্ঘটনার স্থান থেকে ব্যক্তিকে সরিয়ে দেবেন না। আহত ব্যক্তিকে স্থানান্তরিত করার ফলে পিঠে বা ঘাড়ে গুরুতর আঘাত হতে পারে।