‘আবার হবে তো দেখা’

তিন-কুড়ি-ঊর্ধ্ব বয়সের এক নারী রিকশা চালককে বললেন, ভাই যাবেন? রিকশাওয়ালা জানতে চাইলেন, কোথায়?  মহিলা বললেন, কিশোর জীবনের বালিকা বিদ্যালয়ে। একটু ভেবে ভ্রু কুচকিয়ে চালক বললেন, ‘এই অবেলায় এতদূর।’
 
বুকের মধ্যে হাহাকার করে উঠল, সত্যিই কি জীবনের অনেক দূরে চলে এসেছি? কিন্তু গত ১৫ অক্টোবর, ২০২২, আমার অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের একদল কিশোরী নাজিয়া, রোজানা, বন্দনা, সাফিনা, রোকসানা, কিশোয়ার, লিমা, করোভি, ফেহমিনা, সামিয়া আহমেদ, কনক, নাজিয়া শারমিন, সামিয়া আলী, আফরোজা মিতা এবং ঝুমুর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং ভালোবাসায় আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম কৈশরের সেই বালিকা বিদ্যালয়ে। 

অগ্রণীর প্রাক্তন ছাত্রীদের মিলনমেলা। অনুষ্ঠান গুলশানের জারা কনভেনশন সেন্টারে। সুন্দর সাজানো বিশাল কক্ষে প্রবেশ করতেই উচ্ছল কিশোরীদের আন্তরিক সম্ভাষণ আমাকে ভুলিয়ে দিল বয়সের ভার। অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের পোশাকের রংয়ের নীল সাদা বিশাল আকাশ আজ আমরা সবাই গায়ে জড়িয়েছি। আকাশের বিশালতা আজ ভুলিয়ে দিয়েছে ভেদাভেদ। রবি ঠাকুর দেখলে বলতেন ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।’ নাজিয়া শারমিনের আঁকা ছবি মনে করিয়ে দিল নীল কামিজ, সাদা সালোয়ার আর কড়া মাড় দিয়ে ইস্তিরি করা সাদা ওড়না ক্রস করে পরে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। আমরা আজিমপুর কলোনিতে থাকতাম বলে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। আর আমার বন্ধু স্থপতি মাজহারুল ইসলামের মেয়ে ডালিয়া নওশিন আসতো ব্যক্তিগত গাড়ি চড়ে। তাতে কী! একই পোশাকে আমরা খুবই সুখী বন্ধু ছিলাম। 

অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় ঢাকা

১৯৭১ এসএসসি ব্যাচের কেবল আমরা দুজন এসেছি এই মিলন মেলায়। ৫২ বছর পর দেখা হলো ননীবাবু স্যার, সাইদা আপা, শাহীন আপা এবং কালো আপার সাথে। আপা এবং স্যারদের সঙ্গে প্রকোশলী সংসদ লি.-এর এমডি মিজ্ আসমা হক (১৯৬৯), ডালিয়া এবং আমি এক টেবিলে বসলাম মধ্যাহ্নভোজে। যে শিক্ষকদের সামনে চোখ তুলে কথা বলার সাহস ছিল না, আজ আমরাও তাঁদের মতো ধীরগতিতে পথ চলি। জীবনটা সত্যিই কী অদ্ভুত! 

আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো বাংলাদেশের প্রথম নারী ম্যাজিস্রেকীটদের একজন হিসেবে। করতালিতে মুখরিত হলো হলঘর। কিছু বলতে অনুরোধ করা হলো। 

মনে পড়ে গেল প্রিয় হাসান জান স্যারের কথা, যিনি আমাদের রবীন্দ্র-নজরুলকে চিনিয়েছিলেন গভীর মমতায়। গান এবং কবিতার প্রতি নেশা ধরিয়ে দিয়েছিলেন, যা আজো লালন করছি। বলতেন, মন খারাপ হলে বিশাল আকাশের দিকে তাকাবে; সম্ভব হলে পাহাড় এবং সমুদ্র দেখতে যাবে; দেখবে—ওদের বিশালতার কাছে তোমাদের দুঃখগুলো কত ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ। স্যারের এই শিক্ষা আজো চর্চা করি। যাঁর দীক্ষা আমাদের সুখের সন্ধান দিয়েছে তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন, আমার হিসাব মেলে না। আজ তাঁকে পেলে বলতাম, চলুন, আপনাকে পদ্মা সেতু দেখিয়ে আনি। 

অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়

১৯৮৪ এর প্রথম দিকের কোনো এক সময়ের কথা তখন আমি ঢাকা কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট। একদিন দেখি শ্রদ্ধেয় বড় আপা (আনোয়ারা মনসুর) ঢাকা কোর্টের বারান্দায়। আমি ছুটে কাছে গেলাম, মনের অজান্তেই পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। বললেন, খুব বিপদে পড়ে এসেছেন। আমি আমার অফিস রুমে নিয়ে বসালাম। জানলাম স্কুলের মাঠের দশ কাঠা জমি নাকি আজিমপুর গোরস্থানের, সে জায়গা দখল নিতে ডিআইটি থেকে বুলড্রেজার এসেছে বাউন্ডারি দেয়াল ভাঙতে। আমি আপাকে এডিসি, ল্যান্ড একুইজিশন স্যারের রুমে নিয়ে গেলাম। সব শুনে স্যার সঙ্গে সঙ্গে স্থগিতাদেশের চিঠি দিয়ে দিলেন। আপাকে আশ্বস্ত করে বললেন বাকিটা আপনার ছাত্রী করবে, আপনাকে আর আসতে হবে না। কিছুদিন পর চূড়ান্ত আদেশের চিঠি পেলাম, আপাকে আসতে বললাম। চিঠিতে ১৯৫৭ সাল থেকে যে জায়গা স্কুলের মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা স্কুলের দখলেই থাকবে, সেই মর্মে ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনা দেওয়া হয় ডিআইটি-কে। আপা চিঠিটা পড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন। কাছে গেলে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি আপার বুকের ভেতর কান্নার শব্দ অনুভব করি, ততক্ষণে আমার চোখ ভিজে গেছে, আপা চোখ মুছলেন, কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘এখানেই আমার জীবনের সার্থকতা।’ আরো বললেন তুমি অনেক বড় হবে। বুঝতে কষ্ট হলো না অগ্রণী স্কুলকে কেন তাঁর সন্তানতুল্য বলা হয়। আজ বড্ড অপরাধ বোধ হচ্ছে, সেদিন চিঠিটা কেন স্কুলে গিয়ে আমি নিজে দিয়ে আসলাম না। 

সেদিন অনুষ্ঠানে ২১শে পদকপ্রাপ্ত আমার বন্ধু কণ্ঠযোদ্ধা ডালিয়া নওশিন সবার অনুরোধে গান শোনাল, সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে, 
‘সেদিন আর কত দূরে, 
যখন প্রাণের সৌরভে সবার গৌরবে 
ভরে রবে এ দেশ 
ধন ধান্যে শিক্ষায় 
জ্ঞানে-মান্যে আনন্দের গানে গানে সুরে।।
... এ দেশ আমার, এ দেশ তোমার বুকের ধন, 
করো যতন যেন না কেউ 
কাড়ে সেই রতন, 
হায় বিভেদ বিচ্ছেদ শেষ দাও করে।’

গায়ে শিহরণ জাগলো, সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনল, দেশের জন্য ভালোবাসায় চোখে জল এলো। আমার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুনর্জগরুকের জন্য যাঁরা কৃতিত্বের দাবিদার, তাঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।
 
জয় বাংলা, অগ্রণী এগিয়ে যাক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক। 

লেখক: প্রাক্তন ছাত্রী, অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়; প্রাক্তন সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার