গত ১৫ অক্টোবর শনিবার ইত্তেফাকের তিন নম্বর পৃষ্ঠায় তিন কলামে একটি ছবি ছাপা হয়েছে। কোনো খবর নেই, তবে ছবিটিই একটি বড় খবর। ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছে : ‘বিদ্যুত্সংকটে সারা দেশে বেড়েছে লোডশেডিং। তা সত্ত্বেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঘোষিত রেড জোনে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিদ্যুতের অবৈধ লাইন নিয়ে চলছে হকারদের বাণিজ্য।’ এটি গুলিস্তান এলাকার চিত্র। তবে চোখ-কান খোলা রাখলে দেখা যায়, এই চিত্র রাজধানী ঢাকার অন্যান্য এলাকায়ও রয়েছে। এমনকি সারা দেশেও এই চিত্র বিচিত্র নয়।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর ফুটপাত ও রাস্তার ওপর গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুতের বাতি জ্বলে। একটি বাতি থেকে দিনে গড়ে ২০ টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ দিয়ে মাসে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী চক্র। সারা দেশের হিসাব নিলে রাষ্ট্রীয় এই ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হবে। তাছাড়া এ বছরের এক পরিসংখ্যান বলছে, গ্যাসের মতো বিদ্যুৎ খাতেও সিস্টেম লসের কারণে অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ১ শতাংশ সিস্টেম লস মানেই অন্তত ৭০০ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হয় বিদ্যুৎ খাতে। এসবের দায় শেষ পর্যন্ত চাপে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
গত এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণ। সঞ্চালন লাইন বেড়েছে ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিতরণ লাইন বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুত্সুবিধার আওতায় এসেছে। বিদ্যুত্সংযোগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা হয়েছে। তার পরও বিদ্যুতের অপচয়, অপব্যবহার ও চুরি বন্ধ হচ্ছে না কেন? কেন প্রতি বছর সিস্টেম লস গুনতে হচ্ছে? বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে জ্বালানিসংকট। বেড়েছে ডলারের দাম। তাই ডলারের রিজার্ভ নিরাপদ রাখতে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি বন্ধ রাখা হয়েছে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির এই ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। এই কারণে এখন বিদ্যুত্সাশ্রয়ী নীতিমালা গ্রহণ করছেন বিভিন্ন দেশের মানুষ। ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকগণ বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করছেন এবং এসিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র ও ডিভাইস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। এমন সময় দেশে অবৈধ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন। জনগণ এই শ্রেণির চৌর্যবৃত্তির দায় নিতে পারেন না।
বর্তমান বিদ্যুত্সংকট নিরসনে দুটি কাজ খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। এক. অবৈধ বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। দুই. যত্রতত্র আলোকসজ্জা বন্ধ করতে হবে। অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং যত্রতত্র আলোকসজ্জা বন্ধ করা সম্ভব হলে বিদ্যুতের লোডশেডিং কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। বিষয়টি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ অবৈধ সংযোগ বহাল তবিয়তে রয়েছে। এতে সরকারের কার্যক্রমই শুধু ব্যাহত হচ্ছে না, জনসাধারণের দুর্ভোগও বেড়েছে মারাত্মকভাবে। অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি মিল কারখানার উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আর অবৈধ সংযোগ প্রদানকারী উভয়কেই কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
ইতিমধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে দুই সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমরা আশা করি, পরিস্থিতির উন্নতি হবে শিগিগর। আমরা জানি, চার দশক আগে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকাতেই বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা ছিল না। সে সময় দেশের থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষ নির্ভর ছিল কেরোসিন তেলের ওপর। কুপি বাতি, হ্যারিক্যান ও হ্যাজাক লাইট ছিল একমাত্র ভরসা। তাছাড়া সে সময় কেরোসিনের স্টোভে রান্না করেও খেয়েছেন অনেকেই। কিন্তু সেটা এখন আর সম্ভব নয়। এখন ওভেন, রাইসকুকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার বেড়ে গেছে বলে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
বিদ্যুতের সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার পর্যায়ক্রমে প্রতি বিতরণ কোম্পানিতে তদারকির জন্য প্রয়োজনে বিদ্যুৎ বিভাগ মনিটরিং সেল গঠন করতে পারেন। বিদ্যুতের সাশ্রয় ব্যবহারের জন্য অবিরতভাবে প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ঘোষণা দিয়ে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুতের লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সারা দেশে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলিতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বলা হয়েছে। জ্বালানিসাশ্রয় করতে সপ্তাহে এক দিন পাম্পগুলো বন্ধ রাখা হচ্ছে। এর পরও যখন কেউ অবৈধ সংযোগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তখন বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ বিভাগ এসব অবৈধ সংযোগ বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছে বটে, তবে তা আরো জোরদার করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক, শ্রী শ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ