আমাদের সমাজে যেসব সমস্যা রয়েছে, মাদক সেগুলোর মধ্যে একটি। মাদকাসক্তরা এক অবর্ণনীয়, অমানবিক এবং চরম অবহেলিত জীবন যাপন করে। তাদের অধিকাংশই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিতাড়িত। মাদকাসক্তি যে কত বড় সমস্যা, তা ভুক্তভোগী পরিবারই জানে। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিই একটা পরিবারকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। আবার অনেক উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সদস্যরাও মাদক গ্রহণ করে থাকে এবং এভাবে নিজের অজান্তে একসময় নিজে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি মাফিয়াদের সংযোগ (লিংক) রয়েছে মর্মে কেউ কেউ বলে থাকেন।
মাদক ও মাদকাসক্তির ব্যাপকতার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, মাদক অত্যন্ত লাভজনক এক ব্যবসা। কেউ যদি বড় একটা চালান একবার পার করতে পারে, তাহলে এক চালানেই সে ধনী হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজের মধ্যে অবস্থিত। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মাদক উত্পাদন ও তৈরি হয়—এমনটি জানা যায়। সেজন্য বাংলাদেশে সহজে মাদক পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, মাদকাসক্তদের অধিকাংশই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং তারা অলীক ও অযৌক্তিক চিন্তাচেতনায় বিশ্বাসী। চতুর্থত, ধূমপানের অভ্যাস। দেখা যায়, প্রায় সিংহভাগ মাদকসেবী প্রথম জীবনে ধূমপান করত। পঞ্চমত, সমাজের বিভিন্ন স্তরের অধিকাংশ মানুষের তাদের দায়িত্ব পালন না করা। যেমন : পরিবার, শিক্ষালয়, সমাজসেবক, উন্নয়নকর্মী প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ। ষষ্ঠত, চিকিত্সা শেষে পুনর্বাসন বা সামাজীকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের সমাজের সঙ্গে একীভূতকরণ না করা।
আমার খুব দুঃখ হয়, আমরা গৌরবময় অতীত, ঐতিহ্য, বীরত্ব, মেধা, মনন, যোগ্যতা, সক্ষমতা দিনদিন ভুলতে বসেছি। আমরা ১৯৭১ সালে অসীম সাহস, সক্ষমতা, মেধা, যোগ্যতা ও বীরত্বের সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়েছি। আর তাই আমাদের পক্ষে মাদকের মতো এজাতীয় একটি সমস্যার মোকাবিলা করা সহজসাধ্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখের কাছাকাছি মাদকাসক্ত পুরুষ-নারী, যুবক-যুবতি ও কিশোর-কিশোরী রয়েছে বলে মাদক নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিবর্গ এবং রিপোর্ট থেকে জানা যায়। মাদকাসক্তরাও এ দেশের মানুষ, তাদেরও অধিকার রয়েছে এই সুন্দর, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার আলো-বাতাস, পাখির সুমিষ্ট গান ও ফুলের সুবাস নেওয়ার অধিকার। অনেক বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন, মাদক ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত ধনী, শক্তিশালী, আধুনিক অস্ত্রধারী, অনেক সংঘবদ্ধ। তাদের নিজস্ব রসায়নবিদ আছে, এমনকি অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক আছে। কিন্তু তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, অবৈধ অস্ত্রধারীর থাকে না কোনো মনোবল, শক্তি ও সাহস। সে কারণে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন কোনো বিষয় নয়। মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন্তু তারা এই সমাজের সংখ্যালঘু। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের সংখ্যা কোনো ধর্তব্য কিছু নয়। আর তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। মাদকাসক্তরা আমাদের সমাজেরই অংশ। সেজন্য তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব শুধু পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একার নয়, এ দায় সবার।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের বিশেষায়িত মাদক প্রতিরোধ দলের প্রধান হিসেবে কাজ করার সুবাদে মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে আমার কিছু উপলব্ধি আছে। আমাদের এই লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় উপায় অবলম্বন করতে হবে। সেজন্য প্রথমেই আমাদের ডিমান্ড বা চাহিদা কমানোর (উবসধহফ জবফঁপঃরড়হ) দিকে বিশেষ জোর দেওয়া উচিত। কারণ অভ্যন্তরীণ চাহিদা থাকলে মাদক দেশের বাইর থেকে আসবেই। আর যদি বর্ডার একেবারে সিল মেরে দেওয়াও হয়; সে ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে মাদকের কারখানা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের গডফাদারদের ধরার জন্য কাজ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিঃসন্দেহে অনেক কাজ করে চলেছে। তারা বেশ কিছু গডফাদার ধরেছে; কিন্তু তাদের এখন বেশির ভাগ গডফাদার ধরা এবং তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্রাইম প্রসিড অ্যানালাইসিস, লিংক অ্যানালাইসিস ও মামলার এজাহারের ভেতরে মাদকের গডফাদারদের নাম ঢোকাতে হবে। তাহলে গডফাদারদের সহজে ধরা যাবে। এছাড়া গডফাদারদের মানি লন্ডারিং মামলার মাধ্যমেও আইনের আওতায় আনা যায়। আর ক্ষতি কমানো (ঐধত্স জবফঁপঃরড়হ) নিয়ে কাজ করা যায়। এ ক্ষেত্রে অনেক ক্ষতিকর মাদকের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বা হালকাজাতীয় মাদক মাদকাসক্তদের সরবরাহ করা এবং ইনজেকটিং মাদকের ক্ষেত্রে নতুন সিরিঞ্জ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করে মাদকাসক্তদের ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং মাদকাসক্তদের স্বল্পমেয়াদি চিকিত্সা করানো যেতে পারে।
এখন আসা যাক মাদকের চাহিদা কমানোর বিষয়ে। এজন্য প্রয়োজন মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করানো। যেমন :করোনাকালীন পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক তৈরি করে ব্যাপকভাবে চিকিৎসা ও সহায়তা করেছিল। তেমনি সরকারি-বেসরকারি ও এনজিওসমূহ সবাই একত্রে কাজ করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তারপর চিকিৎসা শেষে চাকরি, ব্যবসা বা যে কোনো কাজ দিয়ে তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, সে যেন কোনোক্রমেই পুরোনো বন্ধু বা মাদকাসক্তদের সঙ্গে মিশতে না পারে। মোট কথা, তাকে পরিবার ও সমাজের সদস্যরা সময় দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে, কাজ দিয়ে ও তাদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে সমাজের সঙ্গে মিশিয়ে নেবে। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত যারা সুস্থ জীবনে ফিরতে চায়, তাদের আত্মসমর্পণ করিয়ে নিয়মিত কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে একেবারে কষ্টসহিষ্ণু কাজ না দিয়ে যে যে কাজের উপযুক্ত, তাদের সেরূপ কাজ দেওয়া। আর মাদকাসক্তদের সংশোধনের নিমিত্তে মোটিভেশন, কাউনসেলিং, ধর্মীয় শিক্ষা, দেশাত্মবোধ জাগানো ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া যেতে পারে। আর যারা আত্মসমর্পণ বা সারেন্ডার করতে অনাগ্রহী, তাদের ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত অভিযান পরিচালনা এবং তাদের গডফাদারদের ধরতে হবে ও আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের ধনী ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করে তাদের মাধ্যমে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়। আমাদের দেশের উন্নয়নে কিছু কিছু এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, তাদের এই মহতী কাজে সম্পৃক্ত করা যায়। তারা তাদের কর্মসূচির পাশাপাশি বস্তিতে শিক্ষা কার্যক্রম, শিশু-কিশোরদের সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। পরিবারের পিতামাতা, বড় ভাইবোনদের ছোটদের সময় দিতে হবে, তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। তাদের সমস্যা জানতে হবে। অধিকসংখ্যক খেলার মাঠ, সাংসৃ্কতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। উপরন্তু, সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাসমূহ সক্রিয় করতে হবে এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে। আইনগত কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক বিচার, সামাজিকভাবে বোঝানো, সমস্যা দূরীকরণে সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সমাজের লোকদের কাজে খাটানো যেতে পারে।
আমাদের প্রবাসে রয়েছে এক বিশাল জনগোষ্ঠী। তাদের আছে মেধা, মনন, অর্থ ও সম্পদ। তারা এই সমস্যা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে মাদকের কুফলতা সম্পর্কে বক্তব্য ও বিবৃতি দেওয়া যেতে পারে। সভা-সমাবেশ, র্যালি, পথসভা, উঠান বৈঠক, কমিউনিটি পুলিশিং মিটিং, মাদক নিরোধ সম্পর্কিত নাটক ও সিনেমা ইত্যাদিতে মাদকের কুফলতা সম্পর্কে সবাইকে বলতে হবে এবং সচেতন করতে হবে। আমাদের খেলাধুলা, পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং যাত্রাসহ দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে এবং মাদকের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, মুক্তিযোদ্ধারা বাংলা মায়ের সূর্যসন্তান। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে আমার কাছে অত্যন্ত পজিটিভ এবং মুক্তচিন্তার ধারক ও বাহক মনে হয়েছে। আমরা এখনো জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা নিতে পারি। তাই আমাদের সমাজ থেকে মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে সব অংশীজনকে শামিল করাতে হবে এবং সবাইকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এভাবে সবাই মিলে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালে মাদক ও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং দেশ ও জাতি প্রভূত উপকৃত হবে।
লেখক :অতিরিক্ত ডিআইজি, কমান্ড্যান্ট, পিএসটিএস, বেতবুনিয়া, রাঙ্গামাটি