মনীষী

দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম

বাংলাদেশের এক বিনীত দার্শনিক জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের জন্ম ১৯২৫ সালের ১ মে বরিশালের উজিরপুরের আঁটিপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে। তাঁর বাবার নাম খবিরউদ্দিন সরদার এবং মায়ের নাম সরুফা বেগম। ১৯৪৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। বামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত সরদার ফজলুল করিম জেল খেটেছেন ৭ বছরেরও  বেশি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের হয়ে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এমএলএ নির্বাচিত হন। জেলের কয়েদিদের থাকা-খাওয়ার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে অনশন করেন ৫৮ দিন। পিএইচডি করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি পেয়েছিলেন। পার্টির অন্য সদস্যরা বলেছিল, সরদার পিএইচডি করতে লন্ডনে যাবে আর আমরা আঙ্গুল চুষব, তা হবে না। এ কথায় ব্যথিত সরদার বৃত্তির কাগজ ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানি আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরিও চলে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে পুনরায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে বললে তিনি ফিরে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব কথা সরদার স্যারের লেখাতেই রয়েছে।

অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম কর্তৃক অনুবাদকৃত প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের পলিটিক্স, অ্যাঙ্গেলসের অ্যান্টি ডুরিং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও শিক্ষার জগতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে। 

একটি কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সরদার ফজলুল করিম রাষ্ট্রের জাতীয় অধ্যাপকের পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।  পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও মেধা আর সেইসঙ্গে নিত্য বিনয়াচরণ দিয়ে নিজেকে যে সন্মানিত স্থানে স্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তা বর্তমান অর্থ ও ক্ষমতা নির্ভর সমাজব্যবস্থায় বিরল দৃষ্টান্ত। চিন্তায় গভীর, কিন্তু তা প্রকাশে সহজ ও সরল, ব্যক্তি আচরণে বিনয়ী কিন্তু নীতি ও ব্যক্তিত্বের সংঘাতে দৃঢ়, আকাঙ্ক্ষা ও লোভ ত্যাগে অগ্রগামী এবং সর্বজনীন কল্যাণ চিন্তায় নিমগ্ন এই চিন্তাবিদের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের বর্তমান তরুণসমাজ কি গ্রহণ করবে? প্রশ্নটি এই কারণে যে, অর্থ ও ক্ষমতা নির্ভর চলমান এই সমাজে মেধা, যোগ্যতা ও পরিশ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন না-হওয়ারই দৃষ্টান্ত দেখতে হয় এদেশের তরুণসমাজকে। তারপরও এই সিদ্ধান্তই শ্রেয় যে, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের লোভ-লালসাহীন মেধা ও পরিশ্রম ভিত্তিক জীবনদর্শন ও তাঁর মহত্ কর্মের  দৃষ্টান্ত এ দেশে যাঁরা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে জীবন গঠনে ব্রতী তাঁদের জন্য অনুসরণযোগ্য।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং রাষ্ট্রদর্শনগত দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অস্থির সময় অতিবাহিত করছে। এই সময়ে সরদার ফজলুল করিমের কর্ম, চিন্তা ও নির্মোহ ব্যক্তিত্ব বিকাশের বৈশিষ্ট্যাবলি গভীর বিশ্লে­ষণের দাবি রাখে। নিপীড়ন ও বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে পাকিস্তানি শাসনামলে জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করে সংগ্রাম করে গেছেন এবং স্বাধীনতার পর তাঁর মহত্ চিন্তা ও  লেখনি দ্বারা সে প্রচেষ্টা আজীবন অব্যাহত রেখেছিলেন দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম।