টাইগারদের স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে বৃষ্টি বাগড়ায়

শুক্রবার রাতে যখন মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামলাম, বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। বিমানবন্দরের আনু্ষ্ঠানিকতা শেষে বাইরে এসে দেখি বৃষ্টির তোড়ে রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি জমেছে। তাই হালকা যানজটও আছে। বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমবে, বাংলাদেশে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এমন বৃষ্টিও সচরাচর হয় না, রাস্তায় পানিও জমে না। আমার সঙ্গে মালয়েশিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যারা কুয়ালালামপুর থেকে এসেছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বৃষ্টির কারণে এয়ারপোর্টে আটকা পড়েছেন। এ কারণে এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জে বেশ ভালোই জটলা তৈরি হয়েছে।

আমি এই সুযোগটা কাজে লাগালাম। দুয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। প্রসঙ্গ টি-২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। গত ১৬ অক্টোবর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয়েছে ক্রিকেটের এই মহাযুদ্ধ। প্রথম পর্যায় শেষ করে গতকাল শনিবার থেকে শুরু হয়েছে সুপার টুয়েলভ পর্ব। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে আগামী ১৩ নভেম্বর ফাইনালের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে বিশ্বকাপের। তবে মেলবোর্ন সিটিতে গত দুদিন যাদের সঙ্গে কথা হলো, তাদের অনেকেই বিশ্বকাপের খবর জানে না। এটা নিয়ে তাদের তেমন কোনো আগ্রহও নেই। এয়ারপোর্টে যে শপ থেকে মোবাইলের সিম কিনলাম সেখানে ফ্রন্ট ডেস্কে বসা অস্ট্রেলিয়ান মেয়েটি জানতে চাইল মেলবোর্নে কেন এসেছি। উত্তর শুনে সে বলল, ওমা তাই নাকি। এখানে বিশ্বকাপ ক্রিকেট হচ্ছে নাকি। তা কবে থেকে শুরু হবে।

এর আগে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনের পুলিশ কর্মকর্তা, নামটা মনে হয় জেরি, আমার কাছে অস্ট্রেলিয়ায় আসার কারণ জানতে চেয়েছিল। কারণ ব্যাখ্যা করে তার কাছে পালটা জানতে চাইলাম, বলতো এবার কারা চ্যাম্পিয়ন হবে? সে আমার পাসপোর্টে ‘এরাইভাল, সিল লাগিয়ে স্মিত হাসি উপহার দিয়ে বলল, এটা নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কারণ আমি ক্রিকেট পছন্দ করি না।

মেলবোর্নের ল্যাট্রোপ ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী বাংলাদেশের সুনেহরা জানাল, অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে ক্রিকেট যতটা না প্রিয় তার চেয়ে অনেক বেশি প্রিয় ফুটবল। আবার তাদের ফুটবল খেলার ধরণটা অন্যদের চেয়ে আলাদা, যাকে তারা ‘সকার’ বলে ডাকে। সংক্ষেপে বলে ‘ফুটি’। আমজনতা অস্ট্রেলিয়ানরা সারা বছর এই ফুটি নিয়েই মেতে থাকে। অস্ট্রেলিয়া ফুটবল লিগ (এএফএল) ভীষণ জনপ্রিয় এখানে। 

অস্ট্রেলিয়ায় টি টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের আসর বসেছে। অথচ এয়ারপোর্টের ভেতরে-বাইরে কোথাও কারো মধ্যে সামান্যতম উচ্ছ্বাস নেই। বিমান থেকে নেমে ডিউটি ফ্রি শপের দিকে হেঁটে আসার সময় দেওয়ালের এক কোনায় লাগানো একটা ডিজিটাল স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের একটা ভিডিও চিত্র দেখা গেল। ব্যস, ঐ অতটুকুই। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মেলবোর্ন সিটির যতটুকুই দেখলাম, কোথাও ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে আহামরি কিছুই চোখে পড়ল না। অথচ বাংলাদেশে এমন একটা খেলার আসর হলে কি এলাহী কাণ্ডই না ঘটে যেত। এয়ারপোর্ট থেকে স্টেডিয়াম, এমনকি খেলোয়াড়দের হোটেলে আসা-যাওয়ার রাস্তার দুই পাশ সাজানো হতো ব্যানার, ফেস্টুনে। নেতা, নেত্রী বা অমুক ভাই, তমুক ভাইয়ের ছবি দিয়ে দেওয়ালে বাহারি পোস্টার সাঁটানো হতো। নিরাপত্তা তল্লাশির নামে শহর জুড়ে বেড়ে যেত পুলিশের তৎপরতা। খেলার টিকিট বিকিকিনি নিয়ে দক্ষযজ্ঞ লেগে যেত। 

মেলবোর্নের প্যাকেনহ্যাম এলাকার বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান ব্যবসায়ী আহমেদ চৌধুরী জানালেন, ক্রিকেটের প্রতি অস্ট্রেলিয়ানদের অনাগ্রহ নেই। তবে এটা নিয়ে ওরা বেশি মাতামাতি করে না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ক্রিকেট থেকে একরকম মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এখানে ক্রিকেট উদ্দীপনা ভারত উপমহাদেশ থেকে আসা প্রবাসীদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। মেলবোর্ন কিংবা সিডনি গ্রাউন্ডে সারা বছর যত দর্শক প্রবেশ করে, সংখ্যার হিসাবে দেখা যাবে এদের মধ্যে অর্ধেকেরই বেশি আমাদের উপমহাদেশ থেকে আসা প্রবাসী।

এই লেখার শুরুটা হয়েছিল বৃষ্টি প্রসঙ্গে। বৃষ্টি নিয়ে আরো কথা আছে। কাল সোমবার হোবার্টে বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের। টাইগারার ইতিমধ্যে পৌঁছেও গেছে হোবার্টে। তবে তাদের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া বিভাগ। জানিয়েছে, সোমবার সারা দিন হোবার্টের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তুমুল বৃষ্টিপাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই দ্বীপটিতে। এমনকি বন্যাও হতে পারে। প্রথম ম্যাচে জয়ের আশায় বিভোর টাইগাররা। তবে এই আশা ভেস্তে যেতে পারে বৃষ্টি বাগড়ায়।