সাবধান! এদের হাত অনেক লম্বা

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে। থানায় গেলে সেবা মেলে না। অনেক জেলার পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে গিয়েও সেবা পায় না সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি একজন ভুক্তভোগী একটি জেলার এসপির সঙ্গে দেখা করে তার অভিযোগের কথা জানান। তিনি তো কোনো প্রতিকার দিলেনই না, উল্টো ওই ভুক্তভোগীকে বললেন, সাবধান! এদের (অভিযুক্তদের) হাত অনেক লম্বা। তাদের সঙ্গে মিলেমিশে চলেন। নইলে আপনি ঝামেলায় পড়বেন। এভাবেই ভুক্তভোগীর মনোবল ভেঙে দিয়েছেন ওই এসপি।

শুধু ওই জেলা নয়, কমবেশি অনেক জেলার চিত্র এমনই। পুলিশের অভিজ্ঞ দুই জন শীর্ষ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, একজন এসপির এমন কথা বলা অপেশাদারিত্বের পরিচয়। এসপি এমন কথা বললে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? যাদের হাত লম্বা, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই পুলিশের কাজ। একজন পেশাদার পুলিশ অফিসার কখনোই এমন কথা বলতে পারেন না। নিশ্চয়ই টাকার বিনিময়ে ওই পদে গেছেন ওই এসপি। একই সঙ্গে শক্তিশালী লোকজনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। এসব অসৎ ও ঘুষখোরদের কারণে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। 

সারাদেশে ইত্তেফাকের স্থানীয় প্রতিনিধিরাও এক শ্রেণীর এসপি ও ওসিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত নানা অনিয়মের প্রতিবেদন তুলে ধরছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই যেন প্রতিকার মিলছে না।

জানা গেছে, মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন এক শ্রেণীর অসাধু এসপি। সংশ্লিষ্ট থানা থেকেও নিয়মিত মাসোহারা পান। এ কারণে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের জন্য তাদের এতো মায়াকান্না। এই ধরনের ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তারা পদ ঠিক রাখার জন্য কিছু অসাধু নেতাকে ম্যানেজ করে চলেন। তাদের এমন আচরণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সামিল।  ভালো কাজের জন্য পুলিশ যেমন সুনাম কুড়িয়েছে, তেমনি কিছু পুলিশ সদস্যের খারাপ কাজে দুর্নামও বাড়ছে।       

করোনার মহামারির সংকটকালে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশ সদস্যরা। কখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে কঠোর লাকডাউন বাস্তবায়ন করেছে পুলিশ। কখনো সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চালিয়েছিল অভিযান। অন্যদিকে খাবারসহ সহায়তা দিয়েছিল হতদরিদ্রদের কাছে। হাসপাতালে রোগীকে পৌঁছে দেওয়া, কোয়ারেন্টিন পালনে সহায়তা করা; চিকিৎসায় সহায়তা করা; করোনায় মারা গেলে জানাজা পড়ানো; কবর খোড়া; দাফন সম্পন্ন; আক্রান্তদের পরিবারকে সুরক্ষায় সহায়তা দেওয়া; ত্রাণ দেওয়ার কাজে সহায়তা করা; অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা; অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন কাজ করে মানবিক পুলিশের স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। করোনাকালে জীবন বাজি রেখে মানবিক সহায়তা করতে গিয়ে ১০৭ জন পুলিশ সদস্য মারা যান এবং ৪০ হাজারের বেশি আক্রান্ত হয়েছিলেন।

বিপরীত চিত্রও রয়েছে। এক শ্রেণীর পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা, অপহরণ, ছিনতাই, নির্যাতন, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, যৌন হয়রানিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে জমা পড়েছে। তবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার শুধুমাত্র কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করতে পারে। কিন্তু মন্ত্রণালয় অভিযোগ গেলে সহসাই পার পেয়ে যান অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা। মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট আছে যারা তদ্বির-টাকার বিনিময়ে যেকোনো অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে ছাড় দিয়ে দেন। এ কারণে পুলিশের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তারা ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নিয়ে থাকেন। সে টাকা উসুল করতে নিজেরাই ঘুষ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। রেঞ্জের এক শ্রেণীর ডিআইজিও সঠিকভাবে জেলার কার্যক্রম মনিটরিং করেন না। অভিযোগ আছে, তারাও নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। এ কারণে ঘুষ লেনদেন, হয়রানি, ডিউটি অফিসারের অসংলগ্ন প্রশ্ন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ভীতিকর আচরণ ও সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করা এখন নিত্যনৈমেত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অসৎ কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের জন্য সত্ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা ভালো কাজ করতে নিরুত্সাহী হন।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, কোনো এসপি পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে কখনোই এমন কথা বলতে পারেন না। এসপির কাজ হলো যারা শক্তিশালী, যাদের হাত লম্বা—তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কখনো কখনো আইনে না পারলে কৌশলে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। হয়তো অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিতে ওই এসপি লম্বা হাতওয়ালাদের সঙ্গে মিলে গেছেন। একজন ভুক্তভোগীকে এমন মন্তব্য করা উচিত হয়নি তার। 

সাবেক আইজিপি শহীদুল হক বলেন, এসপির কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঐ এসপি যেহেতু সেটা করেননি, মনে হচ্ছে তিনি জেলার পুলিশ সুপার হওয়ার অযোগ্য।