কেমন হলো বাজেট

বিশিষ্টজনের মতামত

g রেজাউল হক কৌশিক

 

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বিশাল এ বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি, তরুণদের জন্য তহবিল, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি, সার্বজনীন পেনশন স্কিম চালুসহ নানা প্রস্তাব করেছেন। এগুলোতে খুবই ভালো বিষয় হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়াও তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানো, উদ্যোক্তা তৈরি, শহরের সুবিধা গ্রামে, দারিদ্র্য বৈষম্য নিরসন ও ব্যাংকিং কমিশন গঠনেরমত উদ্যোগগুলোও প্রশংসনীয়।

২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেট আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট। যে কারণে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাজেট। তাই আওয়ামী লীগ গত জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে যেসব বিষয় পরিপালন করবে বলে ঘোষণা করেছিল তার প্রতিফলন কতটা হলো সেদিকে অনেকেই তাকিয়ে ছিলেন। নির্বাচনী ইশতেহারের অনেক বিষয় বাজেটে আসলেও ইশতেহারের বর্ণিত বিষয়ের উল্টো চিত্রও দেখা গেছে।

বাজেটে সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেটে প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থ। অবশ্য কীভাবে সে অর্থ আসবে তার বিস্তারিত বর্ণনা না থাকলেও একটা ধারণা দেওয়া আছে। মূলত, রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বাজেটে রাজস্ব বাবদ মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করতে জনসাধারণের উপর চাপ আসতে পারে।

একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া নাই। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করার জন্য কোন মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকার দরকার ছিল। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) দেশের উন্নয়নের জন্য অন্যতম নিদর্শন। তবে আমরা দেখি এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শেষের দিকে তাড়াহুড়া করে অর্থ খরচ হয়। ফলে সুফল পাওয়া যায় না। তাই প্রথম থেকে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শুরু থেকেই কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই। বাজেটে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা নেই।

ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি, বাজেট ঘাটতি। এসব বড় বড় চ্যালেঞ্জের জন্য সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের সংস্কারমূলক দিকনির্দেশনা ও একগুচ্ছ প্রণোদনা প্রদান করে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। পুঁজিবাজারকে সম্প্রসারণ ও গতিশীল করার জন্য সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করার বিষয়ে ডিএসই সন্তুষ্ট হলেও বাজারে কী প্রভাব পড়বে সেজন্য অপেক্ষা করতে হবে।

n কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বিশিষ্ট অর্থনীতিবীদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন বর্তমান সরকারের যে নির্বাচনী ইশতেহার ছিল সে অনুযায়ী বাজেট দেওয়া হয়েছে। ইশতেহারের বেশকিছু বিষয় এ   বাজেটে তুলে আনা হয়েছে। যেমন, তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানো, উদ্যোক্তা তৈরি, শহরের সুবিধা গ্রামে, দারিদ্র্য বৈষম্য নিরসন ও ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো বাজেটের প্রশংসনীয় দিক হলেও বাজেটে সমস্যা হচ্ছে দুটো। এক, ব্যাংকিং খাতে সমস্যার নিয়ে যা বলা হয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। দুই, লক্ষ্যমাত্রা যেটা দেওয়া হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন  বেশ কঠিন।

 

n রুবানা হক

প্রস্তাবিত বাজেটে ৭০ ভাগ খুশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক। বাজেটে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ অর্থ  যত্সামান্য। আরো বেশি ক্যাশইনসেনটিভ দেওয়ার কথা    বলেন তিনি।

 

n ড. সেলিম রায়হান

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, এটি একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাজেট। এত বড় বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দেওয়া নাই। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকার দরকার ছিল। তবে বাজেটে অনেক ভালো দিক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

n শহীদুল হক মুকুল

বাজেটে বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক শহীদুল হক মুকুল। তিনি বলেন, বাজেটে রপ্তানিমুখী খাতে প্রণোদনা, গার্মেন্টস খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পের সবগুলোই ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের। ভারী শিল্প তেমন নেই। কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ভারী শিল্পের প্রয়োজন। বাজেটে ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠার জন্য তেমন কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আবার ব্যক্তিশ্রেণির যেটা করা হয়েছে তার চেয়ে বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। এই সীমা ৫ লাখ টাকা হলে ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি।

 

n দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে কতগুলো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। আমাদের ধারণা ছিল সেই প্রতিশ্রুতিগুলোকে উল্লেখ করে, সেগুলোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হলো, সেরকম একটা ব্যবস্থা আমরা লক্ষ করব। দুঃখজনকভাবে আমরা এই মুহূর্তে তা পেলাম না।

 

n ওসামা তাসির

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি ওসামা তাসির বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট  আশাব্যঞ্জক। এটি একটি ধারাবাহিক বাজেট। তবে এ ধরনের বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য।

 

লিয়াকত আলী ভূইয়া

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লিয়াকত আলী ভূইয়া বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে নিবন্ধন ফি এবং স্ট্যাম্প ফি হ্রাস করা করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা যুগান্তকারী। এ প্রস্তাবের ফলে আবাসন খাতে বিদ্যমান স্থবিরতা বহুলাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।