নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা

g রেজাউল করিম খোকন

 

আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ব্যাংকের সব গ্রাহক। আজকাল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে ব্যাংকগুলোও। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে তত্পর হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ নানা চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি এটিএম বুথ থেকে একদল বিদেশির জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা চুরির চাঞ্চল্য ঘটনা ধরা পড়েছে। যা জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ইতিমধ্যে তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটিত হয়েছে অনেক অজানা তথ্য। দেশের ব্যাংকিং খাতকে টার্গেট করে এটিএম বুথের যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপের সদস্যরা ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে।

জানা গেছে, এটিএম যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ জালিয়াতি চক্রের গোপন যোগাযোগ রয়েছে। এসব কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা। সাপ্লাই সোর্সকে ধরতে না পারলে শুধুমাত্র হ্যাকার গ্রুপের সদস্যদের আটক করে এ ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হবে না। এর আগে এটিএম কার্ড ক্লোন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বুথ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের অনেক ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা কেবলমাত্র ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্যই নয়, তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও উদ্বেগজনক। যদিও বহু আগে থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ চুরির ঘটনা ঘটে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে শুরু করায় সংশ্লিষ্ট সবাই নড়েচড়ে বসছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, গ্রাহক সবাই দারুণ এক উত্কণ্ঠার মধ্যে পড়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে আরো উত্কণ্ঠার বিষয় হলো এ ধরনের ঘটনায় বিদেশিদের জড়িত থাকা। যদিও ইতিমধ্যে এটিএম বুথ থেকে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কাজে জড়িত একদল বিদেশিকে পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মহাপরিকল্পনা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এক সময় বিভিন্ন ব্যাংক শাখার ভল্ট এর তালা ভেঙে কিংবা সিঁধ কেটে ব্যাংকের ভল্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি, ডাকাতির ঘটনা সবাইকে চমকে দিলেও আজকাল তেমন ঘটনা অনেক কমে এসেছে। সময়ের বিবর্তনে ব্যাংকগুলো নতুন করে সাইবার তথা ডিজিটাল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থার মতো ব্যাংক ডাকাতির ইতিহাসও পুরনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে অপরাধের ধরন।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু নব্বইয়ের দশকে। যদিও শুরুতে প্রযুক্তি এতোটা আধুনিক ছিল না আজকের মতো। তখন ছোট ছোট সফটওয়্যার ব্যবহার করা হতো। কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার অনেকগুণ বেড়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। দেশের সব ব্যাংকই এখন ডিজিটাল সেবা প্রদান করছে গ্রাহককে। এতে খুব সহজে কম সময়ে দ্রুত আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান সুনিশ্চিত হয়েছে। আমাদের এখানে কিছু দেশীয় ব্যাংক রয়েছে যাদের আইটি উত্কর্ষ আন্তর্জাতিকমানের। আইটি ব্যবহারের দিক থেকে আমরা যতটা এগিয়েছি, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য বিষয়গুলো ঠিক সেভাবে এগোয়নি। আমাদের ব্যাংক খাতে আইটির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোকের অভাব। এর পাশাপাশি সচেতনতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। প্রযুক্তির কিছু ঝুঁকি সব সময়ে থাকবে। প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি বদলাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। তাই সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হলে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নতুন গতি সঞ্চারকারী আইসিটি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে অবহেলিত অবস্থায় রেখে দিলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। এ খাতের নীতি-নির্ধারকদের পুরনো মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে বাস্তবতার নিরিখে। সাইবার ঝুঁকির বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিরাপদে নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাবে, আমাদের প্রত্যাশা।