১৯৭০ সালে ক্রিকেট সফর বাতিলের কারণে ক্ষুব্ধ এক বিক্ষোভকারী লন্ডনে লেবার পার্টির নেতা ও যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের গায়ে ডিম ছুড়ে মারেন। ঘটনার পর উইলসনের প্রতিদ্বন্দ্বী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ রসাত্মক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘এটি ছিল গোপন সফর নিয়ে এক গোপন বৈঠক, যা কারো জানার কথা নয়। কিন্তু ঘটনা যা ঘটেছে, তাতে করে বলতে হয়, এ দেশে পুরুষ এবং সম্ভবত নারীরাও পকেটে ডিম নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীকে হাতের নাগালে পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায়!’ যুক্তরাজ্যের সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের গায়ে ডিম ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটেনি যদিও, তবে তার সঙ্গে ভদ্র-সভ্য আচরণও কিন্তু করা হয়নি। অবাস্তব অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করার কারণে ট্রাসের হাত ধরে ব্রিটিশ পাউন্ড স্মরণকালের তলানীতে নামার পর সদ্য পদত্যাগ করা এই প্রধানমন্ত্রীর গদির অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, তা লেটুস পাতার (শেলফ লাইফ বা আইসবার্গে লেটুসের মাথা বা পাতা বেশ কয়েক দিন স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে) জীবনকালের চেয়েও কম সময়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। বাজে সব নীতি গ্রহণ করার কারণে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ধস নামার পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই নজিরবিহীন তিরস্কারের বোঝা মাথায় নিয়ে সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন ট্রাস। তিনি ব্রিটিশ মসনদে বসার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৪৫ দিন। ব্রিটিশ ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার রেকর্ডের ঘরে লেখা হয়েছে লিজ ট্রাসের নাম।
ট্রাসের পদত্যাগের ঘোষণার পর ‘দ্য হাউজ’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের সাবেক পলিটিক্যাল এডিটর রোজা প্রিন্স লেখেন, ‘মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় থেমে যেতে হলো লিজ ট্রাসকে। বহু জল্পনা-কল্পনা ও নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সিংহাসনে বসা ট্রাস ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেননি, মাত্র দেড় মাসের জন্য তিনি অফিসে বসার সুযোগ পাবেন!’
রোজা প্রিন্স বলেন, ‘বলতেই হয়, বহু নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা লিজ ট্রাসের মাত্র ছয় সপ্তাহের শাসনকালে কি না ঘটতে দেখা গেছে! মাত্র কয়েক দিনেই একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন ব্রিটিশ জনগণ। রাজার মৃত্যু ও মসনদে নতুন রাজা, দেশের বাজারে অস্থিরতা, বিপর্যয়ের মুখে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতি, খেয়ালি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, ব্রিটিশ মুদ্রা তথা পাউন্ডের স্মরণকালের দরপতন, চাপের মুখে গৃহীত নীতি-কর্মসূচি পরিত্যাগে বাধ্য হওয়া, নিজের চ্যান্সেলরকে তিরস্কার-বরখাস্ত করা, পদ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফা ও কার্যত সব এমপির আস্থা হারানো, সংসদে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও হিংসাত্মক উৎপীড়নের অভিযোগ এবং পরবর্তী নির্বাচনে জনমত জরিপের নিদারুণ কশাঘাতে নিজ দলের অবস্থানকে অস্তিত্বের সংকটে উপনীত করে প্রধানমন্ত্রীর মস্তাবনত বিদায়—এসব একেকটি ইতিহাস হয়ে রইল ব্রিটিশ রাজনীতির ডাইরিতে।’
প্রধানমন্ত্রী ট্রাস ও তার পতন সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি করেছেন রোজা প্রিন্স—বরিস জনসনের বিদায়ের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ‘দৌড় প্রতিযোগিতায়’ বিজয়ী হওয়ার পর লিজ ট্রাসের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে নিজ দল টোরি পার্টিকে ঐক্যের কাতারে নিয়ে আসা। কিন্তু এই কাজ যে ট্রাসকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাবে, এটা অজানা ছিল না কারো; এমনকি এ বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন না ট্রাস নিজেও। সত্যিকার অর্থেই ব্যাপক সমস্যাগ্রস্ত টোরি পার্টিকে একত্র করে দলে ঐক্য ফেরানোর মতো কাজ সহজসাধ্য ছিল না ট্রাসের জন্য। বস্তুত, ট্রাসের কপাল পোড়ার সূত্রপাত ঘটে এখান থেকেই। ক্ষমতায় আসার পর নিজ দলকে একত্রিত করা এবং সরকারে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কার্যকারিতা গুরুত্ব দিয়ে মতৈক্যের সেতু নির্মাণের পথে না হেঁটে ভুলভাল সব সিদ্ধান্তের রাস্তা ধরেন ট্রাস। তাৎক্ষণিক নানা বিদ্বেষের সূত্রপাত ঘটিয়ে ঘরেবাইরে বিরক্তি ছড়াতে শুরু করেন তিনি। মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের পছন্দের লোকজনকে বসিয়ে নিজের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগের তির ছোড়ার কাজটি সহজ করে দেন ট্রাস। ‘ট্রাস ও তার দল অনভিজ্ঞ, বিকলাঙ্গ এবং অযোগ্য’—এজাতীয় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন ট্রাস।
উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন, বেঞ্জামিন ডিসরায়েলি, ডেভিড লয়েড-জর্জ, উইনস্টন চার্চিল, ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ও মার্গারেট থ্যাচারের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বদের অলংকৃত চেয়ারে বসার সুযোগ ঘটে বরিস জনসনের মতো অযোগ্য নেতার। জনসনের বিশৃঙ্খল, বাজে নেতৃত্বের কারণে পূর্বের সব নেতা-প্রধানমন্ত্রীর অর্জন, সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে ট্রাসের কৃতকর্মের ফলাফল জনসনের চেয়ে আরো বেশি করুণ!
২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়ে এবং মুক্তবাণিজ্যের বলয় থেকে বেরিয়ে আসার বিপর্যয়কর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘তৃতীয় স্থানীয় শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে ব্রিটেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের জন্য ডেকে আনে এক ভয়াবহ ‘অর্থনৈতিক বিপর্যয়’, যা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। যুক্তরাজ্যের নির্মাণ, কৃষিকাজ, নার্সিং হোম ও রেস্তোরাঁর মতো বিভিন্ন সেক্টরের চাকরিগুলো আগে ইউরোপীয়দের দ্বারা পূরণ করা হলেও ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময় থেকে তা খালি থেকে যাচ্ছে। এর বিরূপ ফল গুনতে হচ্ছে ব্রিটেনের অর্থনীতিকে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্যমতে, ব্রেক্সিট ভোটের পর থেকে যুক্তরাজ্যের মাথাপিছু আয় প্রকৃত অর্থে মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ইইউতে বৃদ্ধি পেয়েছে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
অনেকেই যুক্তি দেখিয়ে বলছেন, ‘যুক্তরাজ্য, ইরান ও ভেনিজুয়েলার মতো আমেরিকার গুরুতর সমস্যাগুলোও দিনকে দিন অনেক বেশি বিবর্ণ হয়ে উঠছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে বিশ্বব্যাপী প্রভাব ধরে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবিরতভাবে যে চেষ্টা চালিয়ে থাকে, তাতে করে সাম্প্রতিক সময়ে জনসমর্থনের প্রশ্নে নাটকীয় পতনের সম্মুখীন হয়েছে দেশটি। অন্যদিকে ইউক্রেন আক্রমণের পর যুদ্ধে সুবিধা করে উঠতে না পেরে, অর্থাৎ লক্ষ্য অর্জনে পুতিন ব্যর্থ হওয়ায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, রাশিয়া এখন আর কোনো বড় শক্তি নয়। এই যে লক্ষ্য অর্জন কিংবা তা পূরণে ব্যর্থতা—এর কারণেই বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশ কিংবা সরকারপ্রধানদের কাছ থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
লিজ ট্রাসের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এরকমটাই। ওয়াশিংটন পোস্টে হেনরি ওলসেন লিখেছেন, ‘আনীত প্রস্তাবের পক্ষে জনমত তৈরি করতে ব্যর্থ হন ট্রাস। এর মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয় যে, ব্রিটিশ সমাজের কোনো না কোনো অংশে ট্রাস ও তার দলের প্রতি পর্যাপ্ত সমর্থন ছিল না, তথা জনসমর্থনের ঘাটতি ছিল।’
যা হোক, ট্রাসের বিভিন্ন নীতি ও কৌশল একের পর এক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার ফলে কারো বুঝতে বাকি ছিল না যে, ট্রাসের খেলা শেষ হয়ে এসেছে, বাকি নেই কিছুই। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের মধ্য দিয়েই সমস্যার সমাধান টানতে বাধ্য হন ট্রাস। টোরি এমপিদের প্রভাবশালী ১৯২২ কমিটি চেয়ারম্যান স্যার গ্র্রাহাম ব্র্যাডলির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১০ নম্বরে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, ‘যে ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষ থেকে আমি দায়িত্ব নিয়েছি, তার কিছুই দিতে পারিনি। তাই আমি মহামান্য রাজার সঙ্গে কথা বলেছি তাকে অবহিত করার জন্য যে, আমি কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদ ত্যাগ করছি।’ ট্রাসের এই ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে পর্দা নামে ‘ট্রাস ফ্যান্টাসি’র—মাত্র ছয় সপ্তাহের ট্রাস জমানার পতন ঘটে।
ট্রাসের এভাবে পদত্যাগের পর এখন একটাই প্রশ্ন সামনে আসছে—এরপর কী হতে চলেছে? এর উত্তরে বলতে হয়, আগামী দিনগুলোতে ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য অপেক্ষা করছে আরো বেশি জটিলতা। পার্টির নিয়ম কাটছাঁট না করা হলে নতুন কনজারভেটিভ নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে আবারও ট্রাসের মতো অজনপ্রিয় নেতা বসার সুযোগ পেয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। এরূপ অবস্থায় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রার্থী খোঁজার বিষয়ে একমত হওয়াটাই সংসদীয় দলের জন্য হবে বুদ্ধিমানের কাজ। মোটকথা, সামনের দিনগুলোতে মতৈক্যের ভিত্তিতে এবং দলীয় শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে এগোতে ব্যর্থ হলে তা যুক্তরাজ্য ও কনজারভেটিভ উভয়ের জন্যই নতুন করে খারাপ অবস্থা ডেকে আনতে পারে। এতে করে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠবে। কাজেই টোরি পার্টি কিংবা যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর স্বার্থের প্রশ্নে এ বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করা আজকের দিনে অনেক বেশি জরুরি।
লেখক : সিএনএনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
সিএনএন থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন