গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল!

চিররঞ্জন সরকার

বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা চান্স পেলেই যেমন জাতির জনক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করার চেষ্টা করেন, ঠিক তেমনি আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল নিয়ে কু-তর্কে মেতে ওঠেন। সে দিন এক আড্ডায় কথা হচ্ছিল, ভেজাল নিয়ে। সেখানে একজন নব্য টকশোজীবী হঠাত্ করে কোনো কার্যকারণ ছাড়াই বলতে শুরু করল, ‘দেশ স্বাধীনের পর আমাদের অনেক কিছুই গোজামিল দিয়ে শুরু করা হয়েছে। যেমন— কাঁঠাল। কাঁঠাল কোন যুক্তিতে জাতীয় ফল হয়? কাঁঠাল যদি জাতীয় ফল হয়, তাহলে খন্দকার মোশতাকও জাতীয় নেতা। সে তার একক বক্তৃতা চালিয়েই যায়, সজারু আর খরগোশ কি এক? খরগোশ দেখলেই একটা মায়া জন্মায়, আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সজারুর শরীরের কাঁটা দেখলেই তো কেমন একটা পালাই পালাই ভাব দেখা দেয়। আসলে আমরা মুখে যত কথাই বলি না কেন, গুণের পাশাপাশি চেহারাও একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু চেহারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে কাঁঠালের মতো একটা বেঢপ রূপ-লাবণ্যহীন ফল আমাদের জাতীয় ফলের মর্যাদা পেল? আর এ ধরনের গোজামিলের কারণে এখনো আমাদের গণতন্ত্রে ভেজাল, খাদ্যে ভেজাল, মানুষে ভেজাল, দলে ও রাজনীতিতে ভেজাল!’

কাঁঠাল নিয়ে এ ধরনের কথা অবশ্য আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। অনেকেই জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নিজেদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সবার একটাই কথা, কেন, আম বাদ দিয়ে কাঁঠালকে জাতীয় ফলের মর্যাদা দিতে হবে? আমের কী কোনো তুলনা আছে? আম খায় না বা পছন্দ করে না, এমন মানুষ খুবই বিরল। অথচ কাঁঠাল অনেকেই পছন্দ করে না। অনেক শহরের তরুণীকে দেখেছি, কাঁঠালের গন্ধে তাদের সংজ্ঞা হারানোর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেদিনও আড্ডার সেই নব্য টকশোজীবী বন্ধু জোর দিয়ে বলে গেলেন, কাঁঠালের পরিবর্তে আমকে জাতীয় ফলের মর্যাদা দেওয়া, আর দোয়েলের পরিবর্তে কাককে জাতীয় পাখির মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবি!

আমাদের জাতীয় জীবনে প্রধান অগ্রাধিকার কী, তা নিয়ে অবশ্য মতের কোনো শেষ নেই। কেউ বলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। কেউ বলে স্বাস্থ্যের মান উন্নীত করতে হবে। কেউ বলে দক্ষতা বাড়ানোর কথা। কেউ বলে কৃষকের সমস্যার সমাধান। কেউ বলে শিল্প চাই, কেউ উদ্যোক্তা সৃষ্টির কথা বলে। কেউ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলে, কেউ বলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার কথা। আবার কেউ বলে সুশাসনের কথা। কেউ বলে বৈষম্য কমানোর কথা। কেউ জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ নিয়ে কথা বলে, আবার অনেকে বলে যন্ত্রপ্রযুক্তির সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর কথা। এখন এত সব অগ্রাধিকারের মধ্যে আমের পরিবর্তে কাঁঠালকে জাতীয় ফল ঘোষণার দাবি আদৌ ধোপে টিকবে কি না, কে জানে?

আমাদের দেশে অবশ্য দাবিদাওয়ার কোনো শেষ নেই। সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে যদি কোনো সমীক্ষা করা হয়, তাহলে হয়তো দেখা যাবে ষোলো কোটি মানুষ বত্রিশ কোটি দাবি তুলে বসে আছে! আবার যদি বলা হয়, কেউ কোনো দাবিদাওয়া তুলতে পারবে না, যদি ভুলেও কেউ কোনো দাবিদাওয়া তোলে, তবে তার বিরুদ্ধে আইসিটি অ্যাক্টে মামলা করা হবে! দেখবেন তাতেও সবাই সন্তুষ্ট চিত্তে জীবন কাটিয়ে দেবে। কি খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কতটা সুখে আছি— এই নিয়ে প্রতিদিন ফেসবুকে আধা ঘণ্টা পর পর আপডেট দেবে। এই দেশের মানুষ সবই পারে। কে কতটুকু ঘেউ ঘেউ করবে— তা নির্ভর করছে মুগুর ব্যবহারের অনুপাত ও মুগুরের ওজনের ওপর।

যা হোক, আমাদের মূল আলোচনা কাঁঠালকে নিয়ে, আমরা সেখানেই ফিরে আসি। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে গায়ে কাঁটাযুক্ত গ্রীষ্মের এই ফলটি ঋণখেলাপিদের মতো বেশ প্রভাব নিয়েই টিকে আছে। সংস্কৃতিতে একে ‘কণ্টকী’ বলা হয়। কাঁঠালের নামে একটি ফুলও আছে। যাকে বলা কাঁঠাল-চাঁপা বা কাঁঠালি-চাঁপা। এই ফুলটি পাকা কাঁঠালের গন্ধযুক্ত। কবি আল মাহমুদের সেই বিখ্যাত ছড়ায় কাঁঠাল চাঁপার গন্ধের কথা বলা আছে— ‘আব্বা বলেন পড়রে সোনা, আম্মা বলেন মন দে/ পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে!’ আমরা কোনো অলীক বা অবান্তর বস্তুর কথা বোঝাতে ‘কাঁঠালের আমসত্ত্ব’ কথাটি ব্যবহার করি। আবার ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো’ বলেও আমাদের সমাজে একটা কথা চালু আছে। এর অর্থ হচ্ছে—  কাঁচা কাঁঠালের বোঁটায় কিল বা গজ ঢুকিয়ে তাড়াতাড়ি পাকানো; দ্রুত কার্যসাধনের জন্য অস্বাভাবিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তার মানে আমাদের সমাজে অনেক প্রাচীনকাল থেকেই অসাধু প্রক্রিয়া গ্রহণের রীতি চালু আছে। তা না হলে ‘কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো’ কথাটি আসবে কেন?

আবার প্রেমের সঙ্গে ‘কাঁঠালের আঠা’র তুলনা দেওয়া হয়। কাঁঠালের আঠা যেমন কোথাও লাগলে তা আর সহজে ছাড়ে না, প্রেমও অনেকটা তেমন। একবার প্রেম হয়ে গেলে তা আর সহজে ছাড়ে না।

কাঁঠালের অনেক ঔষধি গুণ আছে। কাঁঠালের কচি পাতা বিভিন্ন চর্ম রোগে ব্যবহূত হয়। কাঁঠাল গাছের আঠা গ্রন্থি ফোলায় এবং ফোড়া পাকানোর জন্য প্রলেপ হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা আছে যে, কোনো কারণে পরিশ্রান্ত অথবা ক্লান্ত হলে কাঁঠালের রস তিন-চার চামচ মাত্রায় নিয়ে আধা কাপ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ক্লান্তি চলে যায়। বার্ধক্যের ক্ষয়জনিত দুর্বলতায় অথবা যেকোনো কারণে শরীর ক্ষয় হতে থাকলে যে দুর্বলতা আসে, সেক্ষেত্রে কাঁঠালের রস দুই বেলা পাঁচ-ছয় চা-চামচ করে খেলে দুর্বলতা থাকে না। কাঁঠালের রস খেলে অরুচি দূর হয়। যেকোনো চর্মরোগ যেমন- দাদ, একজিমা, হাজা, চুলকানি ইত্যাদিতে কাঁঠালপাতা সিদ্ধ করে সেই পাচন লাগালে উপকার পাওয়া যায়। এরপরও অনেকে কাঁঠালের ‘যোগ্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আমকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। এ যেন অনেকটা তেমন প্রশ্নের মতো, পর্বত সুন্দর না সমুদ্র? নদী না ঝরনা?

কাঁঠাল যে যথাযথ কারণেই বাংলাদেশের জাতীয় ফলের মর্যাদা লাভ করেছে— সে ব্যাপারে আমাদের নিঃসংশয় হওয়া দরকার। আম কখনো কাঁঠালের সমকক্ষ নয়। মনে রাখা দরকার যে, কাঁঠাল গাছের প্রতিটি অংশই ব্যবহারযোগ্য। যেমন— কাঁঠাল গাছের পাতা দেশি কালো ছাগলকে খাওয়ানো যায়; ক্রমহ্রাসমান হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার ছাড়া আম পাতার তেমন কোনো ব্যবহার নেই। কাঁঠালের বাকল গরুর প্রধান খাদ্য। বিচি মানুষ খায়। কিন্তু আমের বাকল আর বিচি কেউ খায় না। ‘আম আঁটির ভেঁপু’ সাহিত্যের উপাদান হলেও বাস্তবে এর কোনো ব্যবহার নেই। একটি কাঁঠাল দিয়ে একটি পরিবারের খাওয়া হয়ে যায়। কিন্তু আম লাগে প্রায় এক ঢাকি। কাঁঠালের পুষ্টিগুণ আমের তুলনায় বেশি। আমের তুলনায় কাঁঠাল দামে সস্তা। আম কাঠের তুলনায় কাঁঠালের কাঠ ভালো। আম চাষের তুলনায় কাঁঠাল চাষ তুলনামূলকভাবে সহজ ও লাভজনক। একটি গাছে আম ও কাঁঠাল ধরার পরিমাণ ও তাদের বিক্রয়মূল্য হিসাব করলে কাঁঠাল এগিয়ে থাকে। আমের তুলনায় কাঁঠালের রোগবালাই কম হয়। আম ভারতের জাতীয় ফল, অন্যদিকে কাঁঠাল ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ফল। ‘ইসলামিক উম্মাহর’ বিচারে কাঁঠালেরই বিজয়ী হওয়ার কথা!

কাঁঠালের সবচেয়ে বড় যে সমস্যা, সেটা হলো আঠা। এই আঠা যদি একবার গোঁফে লেগে যায় তাহলেই মহাসর্বনাশ। সাবধানীরা তাই কাঁঠাল খাওয়ার আগে গোঁফে ভালোমতো তেল মেখে নেন। কেননা তৈলাক্ত গোঁফে আঠা খুব একটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় না। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাও এখন মুশকিলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ অবশ্য খুব একটা সাবধানী নয়। তারপরও কেন জানি অনেকে গাছে কাঁঠাল দেখলেই গোঁফে তেল মাখতে শুরু করে দেন। আমাদের সুদিন আসবে, ঢাকা শহর দূষণ ও যানজট মুক্ত হবে, দেশ থেকে দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও বেকারত্ব দূর হবে— এমনি নানা আশাবাদ আমাদের কাছে ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ হয়েই রয়ে যায়!

n লেখক :রহ্য রচয়িতা