রাজধানীতে ডেঙ্গু আতঙ্ক

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী

গত সপ্তাহের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহরে প্রতি চার ঘণ্টায় একজন ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। চলতি মাসে এ রোগের প্রকোপ আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে যা কি না নাগরিক জীবনকে বেশ অস্থিরতায় ফেলতে পারে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সকলের সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্যেই এ ক্রান্তিকালীন দুরবস্থা নিরাময় করা সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন্স সেন্টার রুম থেকে জানা যায় চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মোট ৩০৪ জন রোগীর মধ্যে প্রায় ২০০ জন গত মে ও চলতি জুনের ৮ তারিখের মধ্যে আক্রান্ত হন।  জানুয়ারিতে ৩৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১৮, মার্চে ১২, এপ্রিলে ৪৪, মে মাসে ১৩৯ এবং চলতি জুনের ৮ তারিখ পর্যন্ত ৫৫ জন আক্রান্ত হন। আক্রান্তদের মধ্যে দুজন এপ্রিল মাসে মৃত্যুবরণ করেন।

ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাসগণের অন্তর্ভুক্ত মশাবাহিত এক সূত্রক আর এন এ (RNA) ভাইরাসের সংক্রমণই হচ্ছে  ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস যা ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী। এডিস ইজিপ্টি মশা (A. aegypti) ডেঙ্গু ভাইরাসসহ ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক। এই ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ পাওয়া গিয়েছে। যাদের প্রত্যেকেই পূর্ণরূপে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। জীবাণুবাহী এডিস মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ায় তাহলে সেই মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এই জীবাণুবাহী মশাটি যখন অপর কোনো ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন তার দেহে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে খুব সহজে একজন থেকে অপরের দেহে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। প্রধানত তিন ধরনের ডেঙ্গু হতে দেখা যায়, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম।

 ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত অল্প দিনেই সুস্থ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং মৃত্যুও ঘটতে দেখা যায়। সাধারণত ভাইরাস জ্বরের যে লক্ষণ তার সবই ডেঙ্গু জ্বরে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে— সারা শরীরের মাংসপেশিতে বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় । ব্যথা, জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময়ে এলার্জি বা ঘামাচির মতো সারা শরীর জুড়ে স্কিন রাশ বা লালচে দানা দেখা যায়। এ জ্বর কম বা বেশি উভয়ই হতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। খাবারে অরুচি ও বমি বমি ভাব হয়। সাধারণত জ্বর তিন-চার দিন পর ভালো হয়ে যায়, তবে রক্তের প্লেটিলেট কমতে থাকে। কখনো মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে আবার জ্বর আসে এবং শরীরে রাশ দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রচণ্ড মাথা ব্যথার সঙ্গে শরীরেও প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় এবং জ্বর থাকে। কখনো চোখের পিছনে ব্যথা অনুভব করে। যাদের বেশি জ্বর থাকে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে যেমন চামড়ার নিচ,  নাক, মুখ, দাঁত ও মাড়ি,  চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, কফ, বমি ও পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হতে পারে আবার রোগীর রক্তনালী থেকে প্লাজমা লিকেজের কারণে বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে। পানি শূন্যতা বেশি হওয়ায় প্রসাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। চিকুনগুনিয়া সাধারণত দ্বিতীয় বার হয় না তবে ডেঙ্গু দ্বিতীয় বার হলে জটিলতা আরো বেড়ে যায় বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। সাধারণত ৪ ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে ডেঙ্গ জ্বরও ৪ বার হতে পারে।

সাধারণত শহর এলাকায় এ জ্বরের প্রকোপ লক্ষ্য করা যায়। খুবই সাধারণ কিছু নিয়মকানুন যা প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সবসময় সকলের সচেতনতার জন্য প্রচারিত হয় এগুলো মেনে চলে আমরা এ রোগের প্রকোপ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি। আক্রান্ত রোগীকে চিকিত্সকের  পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা দেওয়াসহ নতুনভাবে এ রোগের জীবাণুবাহী মশার আরো প্রসার না ঘটে সেজন্য সকলকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি ঢাকা শহরের সকল শিক্ষিত জনসাধারণ আমরা কমবেশি সবাই এ বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই রাজধানীবাসী এ রোগ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে।

n লেখক : ইন্টার্ন ডক্টর,  ঢাকা মেডিকেল কলেজ