আইএমএফের ঋণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দুই সপ্তাহের মধ্যে

আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আবুল কালাম আজাদ এসব তথ্য জানান।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে মিটিং করেছে। এ ছাড়া তারা আবার আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর এবং ২ ও ৮ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবে।  আইএমএফ কোনো শর্ত দেয়নি উল্লেখ করে আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রথম পর্বের বৈঠকে বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার যে আশ্বাস রয়েছে, সেটি নিয়ে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় ঋণ পাওয়ার বিষ?য়ে আইএমএফ কোনো শর্ত দেয়নি। তবে আর্থিক খাতের সংস্কার, নীতি ও ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

ডলারের বিনিময় হার প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, ডলারের বিনিময় হার প্রস?ঙ্গে কথা হয়েছে। বৈঠকে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলারের বিভিন্ন রেট সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের রেট (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) ৯৭ টাকা আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগু?লোর রেট বাজা?রের ওপর ছে?ড়ে দেওয়া হয়েছে। বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে বসে প্রতিনিধিদল। বৈঠ?কে রিজার্ভ হিসাব পদ্ধতি নি?য়ে আলোচনা হয়।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত, এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলের প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, রিজার্ভের হিসাব বেশি দেখানো হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি, আগে থেকে যেভাবে হিসাব হয়েছে, সেই পদ্ধতিতেই রিজার্ভের গ্রস বা মোট হিসাবটাই প্রকাশ করা হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফসহ বিভিন্ন তহবিলে সরবরাহ করা প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারকেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাবে দেখাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক হিসাব পদ্ধতির সঙ্গে যা সংগতিপূর্ণ নয় বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল দেশের রিজার্ভ ছিল ৩৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করলে যা দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

জানা গেছে, গতকাল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দিনভর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ছয়টি সেশনে বৈঠক করে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। এর মধ্যে তিনটি সেশনেই আলোচনা হয় রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি নিয়ে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান, দুপুর দেড়টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের সঙ্গে বৈঠক হয়। 

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ মনে করে, আপত্কালীন আমদানি দায় পরিশোধের মতো অর্থই রিজার্ভ হিসাবে বিবেচিত হয়। ইডিএফসহ বিভিন্ন তহবিলে সরবরাহ করা অর্থ ‘রেসিডেন্ট টু রেসিডেন্ট’ দায়। সংস্থাটির বিপিএম৬ ম্যানুয়ালের রেসিডেন্ট টু নন-রেসিডেন্ট অনুসারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবায়ন, সংকলন ও রিপোর্টিং পদ্ধতি সংশোধন করতে বলেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলে (ইডিএফ) সরবরাহ করা ৭ বিলিয়ন ও শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া ২০ কোটি ডলার রিজার্ভে দেখাচ্ছে। এ ছাড়া গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডে (জিটিএফ) ২০ কোটি, লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি (এলটিএফএফ) তহবিলে ৩ কোটি ৮৫ লাখ, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানকে ৪ কোটি ৮০ লাখ এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনে (আইটিএফসি) আমানত রিজার্ভে দেখাচ্ছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে রিজার্ভে যে অর্থ দেখানো হচ্ছে, সেখান থেকে ৮ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার বাদ যাবে বলে মনে করে আইএমএফ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নিট ও মোট হিসাব করে বাংলাদেশ। নিট হিসাব থেকে ইডিএফসহ বিভিন্ন তহবিলে জোগান দেওয়া অর্থ বাদ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের গ্রস বা মোট হিসাবটাই প্রকাশ করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আগামীতে অনুষ্ঠেয় বৈঠকগু?লো?য় রিসেন্ট মনিটরিং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড আউটলুক, ইন্টারেস্ট রেট ডেভেলপমেন্ট, সরকারি বন্ড, মনিটরি এক্সচেঞ্জ রেট, রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট, ব্যাংকিং ইস্যুস, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট, এক্সটার্নাল লোন ডিসবার্সমেন্ট আইএমএফ টিএ রিপোর্টস, রিসেন্ট ট্রেড পারফরম্যান্স, রিসেন্ট এক্সচেঞ্জ পারফরম্যান্স, রিস্ক বেসড সুপারভিশন এবং টেকনিক্যাল মিটিং অন এএমএলের বিষয়ে আলোচনা হবে।

এ ছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল ডেটা, অন্যান্য বড় চ্যালেঞ্জ, মনিটরি পলিসি স্ট্র্যাটেজি, এক্সচেঞ্জ রেট প্রেশার, ইনস্টিটিউশনাল অটোনমি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, কমার্শিয়াল ব্যাংক পারফরমস এবং এফএসএপি আপডেটের বিষয়ে এসব বৈঠকে আলোচনা হবে।

ঋণ চেয়ে গত জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে চায় ৪৫০ কোটি ডলার। বুধবার সফররত আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের তিনটি আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থাটির এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দ।

জানা গেছে অর্থমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে আইএমএফ দল বলেছে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আরো কমিয়ে আনুক বাংলাদেশ এবং এ হার অন্তত বাজারদরের কাছাকাছি থাকুক। ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রাখলে যে সুদ পাওয়া যায়, সেটাকেই বাজারদর বলা হয়ে থাকে।  বৈঠকে বন্ডের সুদের হারসহ বন্ড বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও জানতে চেয়েছে আইএমএফের দল। চলতি মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে অনুষ্ঠিত আইএমএফের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছে, তাতেই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ঋণ পাওয়া যাবে।

আইএম এফ একে একে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনসহ (বিইআরসি) বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে। দলটির সঙ্গে আগামী ৮ বা ৯ নভেম্বর শেষ বৈঠক হবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের।