গাইবান্ধায় ভোটে অনিয়মে জেলা প্রশাসনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে তদন্ত কমিটি

গাইবান্ধা-৫ আসনের ভোট অনিয়মে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বরত নির্বাচনি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে নির্বাচন কমিশন গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। এসব নির্বাচনি কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশকে ভোট অনিয়মে জড়িত থাকতে জেলা প্রশাসন থেকে বাধ্য করা হয়েছে বলে তারা লিখিতভাবে কমিটিকে জানিয়েছেন। এজন্য প্রিজাইডিং অফিসারদের অনেকেই লিখিতভাবে কমিটির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে কমিটি। এর মধ্যে ৫০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদন এবং বাকি সাড়ে ৫০০ পৃষ্ঠায় সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের কার্যক্রম কমিটির কাছে সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মান হয়নি। ইসির সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, এখনো আমরা তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাইনি। আশা করছি, রবিবার পাব। তখন দেখব প্রতিবেদনে কী আছে। তবে অনিয়মে কোনো নির্বাচনি কর্মকর্তা জড়িত থাকলে কমিশন পর্যালোচনা করে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

গত ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ আসনে উপনির্বাচনে সবগুলো কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা দিয়ে ঢাকার নির্বাচন ভবন থেকে মনিটরিং করেন কাজী হাবিবুল আউয়াল নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ভোটে অনিয়ম ধরা পড়লে ভোট গ্রহণের চার ঘণ্টার মাথায় ১৪৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫১টি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ভোট শেষের দেড়ঘণ্টা আগেই এ পুরো ভোট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ভোটে অনিয়ম তদন্তে গত ১৩ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন-ইসির যুগ্ম-সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস ও শাহেদুন্নবী চৌধুরী। বৃহস্পতিবার ছিল কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের শেষ সময়। সন্ধ্যায় তিন সদস্যের কমিটি বসে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে সচিবের বাসায় জমা দেন।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান অশোক কুমার দেবনাথ ইত্তেফাককে বলেন, আমাদেরকে বন্ধঘোষিত ৫১টি কেন্দ্রের অনিয়ম তদন্তের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমরা সেইগুলো তদন্ত করে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে সচিবের কাছে জমা দিয়েছি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশকে ভোট অনিয়মে সম্পৃক্ত হতে জেলা প্রশাসন বাধ্য করেছে। কমিটির কাছে লিখিত চিঠিতে প্রিজাইডিং অফিসাররা জানিয়েছেন, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার নির্দেশে একজন এডিসি এবং সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার ইউএনও মিলে প্রিজাইডিং অফিসারদের ‘ভোট সুষ্ঠু হয়েছে’ মর্মে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেন। বিশেষ করে সাঘাটা ইউএনও সরদার মোস্তফা শাহীন প্রিজাইডিং অফিসারদের সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন বলে জানিয়েছেন প্রিজাইডিং অফিসাররা। এ বিষয়ে সাঘাটা ইউএনও সরদার মোস্তফা শাহীন ইত্তেফাককে বলেন, আমি কাউকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করিনি।

চিঠিতে প্রিজাইডিং অফিসাররা ইসির কমিটির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আবার অনেক প্রিজাইডিং অফিসার ঘটনার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। কমিটির প্রতিবেদনে প্রিজাইডিং অফিসারদের চিঠিগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসাররা প্রত্যেকটা চিঠিতে সহকারী রিটার্নিং অফিসার মো. কামরুল ইসলামের নির্দেশনায় ভোটবন্ধের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও কামরুল ইসলাম শুধু সাঘাটার দায়িত্বে থাকলেও ফুলছড়ির বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসাররাও তার নাম সাদা কাগজের চিঠিতে উল্লেখ করেন। প্রত্যেকটি প্রিজাইডিং অফিসারের চিঠি ভাষা ছিল এক ও অভিন্ন। 

এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কমিশনের নির্দেশে আমি সাঘাটার ৮৮টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ রাখার জন্য প্রিজাইডিং অফিসারদের নির্দেশনা দিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সাঘাটা ও ফুলছড়ির ৯৬ জন প্রিজাইডিং অফিসার সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছেন। সাঘাটার স্থগিত ভোটকেন্দ্রের ২৬ জন প্রিজাইডিং অফিসার আমার কাছে ভোটের পরিবেশ না থাকায় ভোটবন্ধের কথা উল্লেখ করে চিঠি দেন।