পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় সেবা কুরিয়ার সার্ভিস খাতে নানা অরাজকতা চলছে। এই কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য সরকারের একটি লাইসেন্সিং অথরিটি রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে কিছু অসাধু কোম্পানি। এসব কোম্পানি জরুরি ডকুমেন্টসহ নানা ধরনের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সঙ্গে নিষিদ্ধ জিনিস যেমন মাদক ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন করছে। তাদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দিন দিন তাদের কাজের পরিধি বিস্তৃতি লাভ করছে। অবৈধ এসব কোম্পানির মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, তেমন আছে কিছু দেশি প্রতিষ্ঠানও। এ অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে এমন কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিগুলো খুঁজে বের করার দায়িত্ব নিয়েছে ডাক বিভাগ। ইতিমধ্যে তারা তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে দেশি এবং বিদেশি মিলিয়ে মোট ২১৩টি কুরিয়ার সার্ভিস রয়েছে। এর মধ্যে দেশি প্রতিষ্ঠান আছে ৯৫টি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠান ৮৮টি। বাকি ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে অন বোর্ড কুরিয়ার সার্ভিস বলা হয়ে থাকে। যারা স্থলবন্দরগুলোতে কাজ করে। এই হিসাব সরকারের লাইসেন্সিং অথরিটির। কিন্তু এর বাইরে এমন কিছু কোম্পানি রয়েছে যেগুলোর না আছে নিবন্ধন, না আছে কারো নিয়ন্ত্রণ। এর মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, আবার কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। বাংলাদেশে কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসা করতে হলে মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সেবা খাতে বিনিয়োগের জন্য অন্যান্য উপখাতের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও কুরিয়ার সার্ভিসের ক্ষেত্রে তা নেই। বিশেষ করে কুরিয়ার সার্ভিসে বিদেশি এবং দেশি বিনিয়োগের অনুপাত কত হবে তা এখনো ঠিক করা হয়নি। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, বিদেশি এয়ারলাইনস এজেন্সি এবং কাস্টমস এজেন্ট ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু বিধিমালা সরকার ইতিমধ্যেই করেছে। কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২০ অনুযায়ী শিপিং ও কাস্টমস এজেন্ট ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোতে শতভাগ দেশীয় মালিকানাধীন জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে।
ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এজেন্টস (লাইসেন্সিং ও কার্য পরিচালনা) বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং ব্যবসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার বিধান রেখে দেশীয় মালিকানাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসাটি একটি সেবা খাত হলেও বিদেশি বিনিয়োগের কোন সীমা-পরিসীমা না থাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে উঠেছে খাতটি। যার ফলে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি উবার, পাঠাও এবং লালামোভ-এর মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন না নিয়েই কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা করছে।
দেশীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, কুরিয়ার সার্ভিস যেহেতু সেবা খাত তাই এখানে বিদেশি বিনিয়োগ একেবারে নামমাত্র। এই খাতে বড় বিনিয়োগ করেও তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। অপর দিকে, বিদেশিরা নামমাত্র বিনিয়োগে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশের অবকাঠামোগত বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও সেবা খাতগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই।
মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিউদ্দিন বলেন, অবৈধ কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছে ডাক বিভাগ। ইতিমধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের মানুষকে মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যাতে তারা অবৈধ কুরিয়ার সার্ভিসের সেবাগ্রহণ না করে।
কুরিয়ার সার্ভিসের মতো এমন একটি সেবা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়ে ড. মো. মাহিউদ্দিন বলেন, মেইলিং আপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন-২০২২-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। আইনটির বিষয়ে যাতে সাধারনরা মতামত দিতে পারে সেজন্য তা ওয়েবসাইটে এবং গণমাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। আইনটি প্রণয়ন হলে তার আলোকে বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে। সেখানে বিদেশি বিনিয়োগসহ অন্যান্য বিষয়াদি উল্লেখ থাকবে। তবে আইন ও বিধিমালা প্রণয়নে সময় লাগবে বলে তিনি জানান।