গত প্রায় দুই বছরে আমরা ব্যাপক অগ্র্রগতি করেছি। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করে আমার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে, যা বাস্তবিক অর্থেই চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ‘মিডল আউট’ ধারণার অবতারণা ঘটেছে নুতনরূপে, যার ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনমানের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। বেকারত্বের হার নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে, যা বিগত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে ৭ লাখসহ সর্বমোট ১ কোটি নাগরিকের চাকরি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। আমার ঘড়িতে লেখা ‘মেড ইন আমেরিকা’ কেবল একটি স্লোগান নয়, আজকের আমেরিকার বাস্তব চিত্র এটি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এরূপ বাস্তবতা দৃশ্যমান।
সত্যি বলতে, দেশের সব খাতকেই আমরা এগিয়ে নিয়েছি। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি এবং এরপর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সামনে মুদ্রাস্ফীতি পথ আগলে দাঁড়ালেও মার্কিন জনগণের জীবনযাপনকে স্বাভাবিক রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলাম আমরা। সিংহভাগ নাগরিক চাকরিতে বহাল আছেন বলেই আমার বিশ্বাস, যদিও চলমান সংকটকালে মুদি, গ্যাস এবং ভাড়া নিয়ে অল্পবিস্তর অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে অনেককে। এই অবস্থায় সংকটাপন্ন পরিবারের খরচ কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন—স্বাস্থ্যসেবা প্রিমিয়াম, ওষুধ এবং জ্বালানি খরচ কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে আমার প্রশাসন। এতে করে শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত নাগরিক এবং তাদের পরিবারের ওপর চেপে বসা বোঝা হালকা হবে বলেই আমি বিশ্বাস করি। ১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রিমিয়াম সহজ করাসহ সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ওষুধের দাম কমানোর জন্য রিপাবলিকান ভোটাভুটি ছাড়াই ‘মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস আইন’ পাশ করেছি আমরা। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই উদ্যোগের ফলে বেশ সুফল মিলবে। আমাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কারণে গ্যাসের দাম কমছে। গ্রীষ্মে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠা গ্যাসের দাম সম্প্রতি ১ দশমিক ২০ ডলার কমেছে; গত কয়েক দিনে কমতে দেখা গেছে আরো ১০ সেন্ট। এর ফলে পরিবারগুলোর প্রকৃত সঞ্চয় স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
উপরিউল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো বহু বিষয়ে এগিয়ে গিয়েছি আমরা। তবে বাস্তব সত্য হলো, এই অগ্রগতি রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখা দেশের দুটি দলের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মার্কিন জনগণ। মনে রাখতে হবে, কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকানদের ‘এমএজিএ ট্রিকল-ডাউন ইকোনমিকস’-এর মতো কিছু পদক্ষেপ ধনী ও বৃহৎ করপোরেশনগুলোকে বাড়তি ছাড় লাভের সুযোগ করে দিতে পারে। খুব ঠান্ডা মাথায় রিপাবলিকানরা এই পরিকল্পনার শতভাগ বাস্তবায়ন ঘটাতে চান চলেছে। বলা বাহুল্য, এর ফলে পরিবারগুলোর খরচ বাড়বে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তুলবে।
আমার প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ‘মেডিকেয়ার (মার্কিন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা)’কে ওষুধের দাম নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করার পুরো এক্তিয়ার দিয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য ওষুধের খরচ বাবদ বছরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার বরাদ্দ করেছি আমরা। মাসিক ইনসুলিনের খরচ বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৫ ডলার। কংগ্রেসে এমন অনেক রিপাবলিকান আছেন, যারা প্রেসক্রিপশনের ওষুধের খরচ কমানোর জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এটি করলে জনগণ চরম বেকায়দায় পড়ে যাবে। সংকটকালে সঞ্চয়ের পরিবর্তে তাদের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে লাখ লাখ মানুষ বিপদের সম্মুখীন হবে—যা বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময় কোনোভাবেই কাম্য নয়।
উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, দেশের বৃহত্তম করপোরেশনগুলোকে নায্য কর দিতে বাধ্য করেছে ডেমোক্র্যাটরা। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫টি ধনী করপোরেশন ফেডারেল আয়করে কোনো অর্থই দেয়নি। সেদিন আর নেই। কেননা আমি ‘ন্যূনতম ১৫ শতাংশ করপোরেট কর আইন’ নথিতে স্বাক্ষর করেছি। সত্যিকার অর্থেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করছি আমি। বছরে ৪ লাখ ডলারের কম উপার্জনকারী কাউকে ফেডারেল ট্যাক্সে এখন এক পয়সাও দিতে হচ্ছে না।
রিপাবলিকানদের দাবি হলো, ন্যূনতম ১৫ শতাংশ করপোরেট কর প্রত্যাহার করা এবং ধনী ও বড় করপোরেশনগুলোর জন্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্যাক্স ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো। এই দাবি মানলে অর্থনীতিতে ১০ বছরে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ঘাটতি দেখা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ধনীদের জন্য কর কমানোসহ সিনিয়র সিটিজেনদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং মেডিকেয়ার কমানোর পক্ষে কথা বলছেন কোনো কোনো রিপাবলিকান—যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট, যিনি রিপাবলিকানদের নির্বাচন করার দায়িত্বে রয়েছেন, এমন একটি পরিকল্পনা এঁটেছেন, যাতে কংগ্রেসকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সামাজিক নিরাপত্তা এবং মেডিকেয়ার রাখা, কাটা বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ভোট দিতে হবে। উইসকনসিনের সিনেটর রন জনসন প্রতি এক বছরে সামাজিক নিরাপত্তা এবং মেডিকেয়ারকে কাটছাঁট করার প্রস্তাব করেছেন। রিপাবলিকানরা এমনকি এও বলছে যে, যদি তারা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে তবে ঋণের সীমা না বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এমনকি যদি না আমরা তাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং মেডিকেয়ার কমানোর দাবির কাছে নতি স্বীকার না করি তবে তারা এমন অবস্থা করবেন যাতে অর্থনৈতিকভাবে আমরা দেউলিয়া হয়ে যাই!
এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—যতক্ষণ আমি প্রেসিডেন্টের চেয়ারে আছি ততক্ষণ সামাজিক নিরাপত্তা এবং মেডিকেয়ার সুরক্ষিত থাকবে। উপরন্তু মার্কিনদের জন্য এটি আরো সহজ করে তোলা হবে; কঠিন করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। মূলত এই কারণেই মহামারির ধকল কাটিয়ে ওঠার সুবিধার্থে পরিবারগুলোর জন্য স্টুডেন্ট লোনের বোঝা কমানোর উদ্যোগ হাতে নিয়েছি আমরা। রিপাবলিকানরা এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে যদিও, তবে আমি কখনই কর্মজীবী এবং মধ্যবিত্ত নাগরিকদের মহামারি ও সংকট থেকে পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে কোনো আপোষ করব না। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের অনায্য দাবি মানার বিষয়ে আমি মোটেও ভাবছি না। ২ ট্রিলিয়ন ট্যাক্স ছাড়ের পক্ষে ভোট দিয়ে যারা ধনী এবং বড় করপোরেশনগুলোকে অযাচিত সুযোগ করে দেওয়ার চিন্তা করতে পারে, তাদের কথা ভাবার এক মুহূর্ত ফুরসত নেই আমার।
সোজাসাপটাভাবে বলতে গেলে, রিপাবলিকান কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। বহু রিপাবলিকান গর্ভপাতের বিষয়ে কংগ্রেসে জাতীয় নিষেধাজ্ঞা পাশ করতে চান। কিন্তু তাদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, ‘কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই আমি এই ইস্যুতে ভেটো দেব।’ আমি আরো বলে রাখতে চাই, ‘সিনেটে আমরা যদি আরো বেশি ডেমোক্র্যাট নির্বাচিত হই এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারি, তাহলে আগামী জানুয়ারীতেই ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলার বিষয়ে এমন ব্যবস্থা করব, যাতে একজন নারীকে গর্ভপাতে বাধ্য করার মতো বিষয় চিরতরে রদ করা যায়।
সত্যিকার অর্থেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ গণতন্ত্রের পরীক্ষায় অবতীর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা এই বাস্তবতাই শিখছি যে, গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে আগেই নিশ্চিত করে কিছু বলাটা মুশকিল। আমাদের উচিত হবে গণতন্ত্রের এই ধারা রক্ষা করা। সকলের উদ্দেশেই অনুরোধ—এই বাস্তবসম্মত ধারা রক্ষা করুন। এই ধারাকেই অগ্রাধিকার দিন, বেছে নিন। কোনো সন্দেহ নেই, গণতন্ত্রই একমাত্র শপথ, যা সত্য ও সুন্দর।
আমি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী যে, মার্কিন জনগণ সে পথেই হাঁটবে যেমনটা হেঁটেছিল ২০২০ সালে। জনগণ আবারও রেকর্ড সংখ্যায় ভোট দেবে ডেমোক্র্যাটদের ব্যালটে এবং এই সত্যকে উন্মোচন করবে যে, গণতন্ত্র এমন এক মূল্যবোধ, যা আমাদের নিজেকে চিনতে সাহায্য করে, করে একত্রিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। সময় অত্যন্ত কঠিন ছিল যদিও কিন্তু হাল ছাড়িনি। সবশেষে বলতেই হয়, আমি কখনোই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী নই, ছিলাম না কখনোই। সামনের দিনগুলোতে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে; আমরা কোন দিকে এগিয়ে যাব—সামনে নাকি পশ্চাতে?
লেখক :মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
সিএনএন থেকে ভাষান্তর :সুমৃৎ খান সুজন