ইদানীং চিংড়ি ব্যবসায়ীরা ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষের অনুমোদনের জন্য সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানাচ্ছেন। কারণ বর্তমানে সারা বিশ্বে যে চিংড়ি রপ্তানি হয় তার ৭৭ শতাংশই ভেনামি জাতের। ফলে ভবিষ্যৎ রপ্তানি বাণিজ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এ শিল্পে।
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টিতে এবং রপ্তানি পণ্যের তালিকায় চিংড়ি একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে চিংড়ি চাষ কৃষিক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয় এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। আমাদের দেশে ৬০ প্রজাতির চিংড়ি পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত দুটি প্রজাতির চিংড়ির চাষাবাদ চলছে—একটি হলো গলদা আর অন্যটি বাগদা। আন্তর্জাতিক বাজারে গলদার রপ্তানি ৩৫ শতাংশ, বাগদা ৬৫ শতাংশ।
অনুকূল জলবায়ু, মাটি ও পানির কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম গলদা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অধিক বর্ধনহার, স্বাদ, উচ্চ বাজারমূল্য ও বিদেশে চাহিদা থাকায় গলদা চিংড়ির চাষ উত্তরোত্তর বাড়ছে। আগে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাতে গলদা চাষ হলেও এখন নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, বরিশাল, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, যশোর, গোপালগঞ্জ ইত্যাদি জেলায় সম্প্রসারণ হয়েছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, মোট উৎপাদিত গলদার মাত্র ৯১ শতাংশ গলদা রপ্তানি হয় এবং অবশিষ্ট ৯ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করছে। রপ্তানি বাজারের জন্য গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ করে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাতকারীরা ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য বাজারজাত করে থাকে। অথচ গলদার সবচেয়ে বড় বাজার অর্থাৎ জাতীয় বাজারে নিরাপদ ও গুণগতমানের গলদার ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের বাজারজাতকরণের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই।
বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য প্রয়োজন হয় লোনা পানির। এর পোনা সৃষ্টি ও চাষাবাদ সবই উপকূলের লবণ পানিতে হয়ে থাকে। ১০ উপকূলীয় জেলায় বাগদা উৎপাদিত হলেও কেবল খুলনা বিভাগেই বাগদা চাষের ৭৬ শতাংশ (১ লাখ ৪০ হাজার হেক্টরের বেশি) জলাশয় বিদ্যমান যা থেকে মোট উৎপাদিত বাগদার ৮১ শতাংশ (৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি) উৎপাদিত হয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বাগদা এখন বিটি শ্রিম্প (ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প) নামে পরিচিত। সুস্বাদু হিসেবে বিদেশে বাগদা চিংড়ির বেশ সুনাম রয়েছে।
চাষিরা উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে সক্ষম হন না। এছাড়া চিংড়ি সরবরাহ ও বিপণন পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী সংশ্লিষ্ট থাকায় সমষ্টিগতভাবে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ও চিংড়ির মান অক্ষুণ্ণ রাখা দুরূহ; ফলে চাষিরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পান না। অগভীর বাগদা চাষ ঘের, ভাইরাসযুক্ত পিএল ব্যবহার ও পিএল নার্সিং না করা, অপরিকল্পিত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি সেবার অভাব, গুণগতমানের উপকরণের অভাব, কীটনাশক ও রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে মাছের উৎপাদন কম হচ্ছে। আবার উৎপাদিত মাছও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভ্যালু অ্যাডেড মৎস্য পণ্য (রেডি টু ইট, রেডি টু কুক ইত্যাদি) পরীক্ষামূলক বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তা থেকে নিরাপদ মৎস্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, কুল চেইন নিশ্চিত করে পণ্য পরিবহন, প্রচার, প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যাপারে সহযোগিতা করা গেলে জাতীয় বাজারে আন্তর্জাতিক মানের মত্স্যপণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং সরবরাহব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় বাজারে চিংড়ির ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের পৃথক সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা গেলে এই সেক্টর জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
‘ভেনামি’ চিংড়ি ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশে চাষ হচ্ছে। এইসব দেশে অতি নিবিড় (সুপার ইনটেনসিভ) পদ্ধতিতে চাষ করার ফলে স্বাভাবিক উৎপাদনের চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি উৎপাদন হয়ে থাকে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় ‘কম মূল্যে’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ আন্তর্জার্িতক বাজারে তারা সহজেই প্রবেশ করছে। বর্তমানে ভেনামি চিংড়ির অধিক উৎপাদনের স্বপ্ন আর আলোচনায় মগ্ন উপকূলের মৎস্য চাষিরা । মৎস্য বিভাগ বলছে, ভেনামি চাষে পরিবেশের প্রভাবটি ভাবতে হবে। এরপরও খুলনার ১১টি মৎস্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে ‘পরীক্ষামূলক’ ভেনামি চাষের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। চাষের পরিবেশের প্রভাবের ‘ভীতি’কে মত্স্যচাষিরা মৎস্য বিভাগের অজ্ঞতা বলে দায়ী করছেন। তৃতীয় আরেকটি পক্ষ বলছে, চিংড়ির আন্তর্জাতিক বাজার এখন দুষ্টচক্রের জালে আবদ্ধ। তবে সবকিছু খেয়াল রেখে আমাদের চিংড়িশিল্পের ভবিষ্যৎ ভাবনার এখনই সময়।
মৎস্যবিদ, যশোর