ই-বর্জ্য সুনামি ঠেকাতে হবে

প্রতিদিনই বাড়ছে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার, সেইসঙ্গে বাড়ছে ই-বর্জ্য। গত এক দশকে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ গুণ। ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম কিছু ফেরিওয়ালা বা মেকানিকের দোকানে বিক্রি করা হলেও ব্যাটারি, মোবাইল, লাইটসহ অধিকাংশ ফেলে দেওয়া হয়। অনেকে আবার এসব নষ্ট ই-বর্জ্য গৃহস্থালি আবর্জনার সঙ্গে পুড়িয়ে ফেলে। দেশে বছরের পর বছর লাখ লাখ মুঠোফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, রাইস কুকার, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, এয়ারকন্ডিশনার, ফটোকপি মেশিনসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অকেজো হয়ে যায়।

বেসরকারি একটি সংস্থার গবেষণা বলছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য জমা হয়। ২০২৩ সালে বছরে ই-বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২ লাখ টন। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০৩৫ সালে ই-বর্জ্য বছরে ৪৬ লাখ টনে দাঁড়াবে। দেশে তিনভাবে ই-বর্জ্য সৃষ্টি হয়। প্রথমত, ব্যবহার ও মেয়াদ শেষে ফেলে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী বা প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে দেশে আসা ইলেকট্রিক সরঞ্জাম এবং তৃতীয়ত, উন্নত দেশগুলো থেকে অবৈধভাবে নিয়ে আসা ব্যবহৃত ও পুরনো ইলেকট্রিক সরঞ্জাম। এসব ই-বর্জ্য সরাসরি মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। যার ফলে মাটিদূষণ, পানিদূষণ এবং স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু ও গর্ভধারী নারীরা। গবেষকরা ই-বর্জ্যকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ই-বর্জ্যের ভারী ধাতু সিসা, সিলিকন, টিন, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা এবং ক্রোমিয়াম। এসব নবজাতকের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। এছাড়াও ফুসফুস, শ্বাসতন্ত্র, থাইরয়েড জটিলতা, ক্যানসার এবং হৃদরোগের মতো জটিলতায় ভুগছে হাজার হাজার মানুষ। পাশাপাশি নষ্ট ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম মেরামতকারীরা ভুগছেন নানা জটিল শারীরিক রোগে।

২০২১ সালের ১০ জুন বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর অধীনে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা শিরোনামের বিধিমালার গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। বিধিমালাতে বলে হয়েছে, এখন থেকে বৈদ্যুতিক পণ্য থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য উৎপাদনকারী বা সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানকেই ফেরত নিতে হবে। নষ্ট হওয়া মুঠোফোন, ল্যাপটপসহ যে কোনো পণ্য প্রতিষ্ঠানকেই ফেরত দিলে ভোক্তারা বিনিময়ে টাকা পাবেন। এ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ই-বর্জ্য ১৮০ দিনের বেশি মজুত রাখা যাবে না। আমদানি করা যাবে না পুরনো বা ব্যবহৃত ইলেকটিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক পণ্য। বিধিমালার শর্ত লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত- ২০১০)-এর ১৫/১ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার, এই অপরাধের ক্ষেত্রে ২ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

ই-বর্জ্য কমাতে জনগণকে সচেতন করতে হবে। অধিকাংশ মানুষ জানেই না ই-বর্জ্য কী? কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। এক্ষেত্রে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিকগুলোর প্রচারণা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে গণমাধ্যম। সরকারের সার্বিক সহযোগিতা জরুরি। ই-বর্জ্য সম্পর্কে উপযুক্ত নীতিমালার অভাব, প্রশাসনের উদাসীনতা, সর্বোপরি ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ই-বর্জ্য থেকে বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার মাধ্যমে দেশের বাজারে ও রপ্তানিতেও ভূমিকা রাখছে। ই-বর্জ্য বাড়ার ফলে ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে স্মার্ট ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিভাইসে মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রিসাইক্লিংয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনে ঋণ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে; তেমনি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখনি ই-বর্জ্যের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিবেশ, মানুষের স্বাস্থ্য এবং আগামীর পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।

শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ