২৭ অক্টোবর ২০২২ তারিখে ‘আইনের তোয়াক্কা করে না পরিচালনা কমিটি’, ১৫ মে ২০১৯ তারিখে ‘ম্যানেজিং কমিটি-গভর্নিং বডির কাজ কী অথচ করে কী’ শীর্ষক দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ২৮ জুলাই ২০১৯ তারিখে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির মূল দায়িত্ব কী’, ১৪ জুন ২০১৫ তারিখে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সম্পাদকীয় পাঠে বলা যায়, প্রকাশিত প্রতিবেদন বেসরকারি শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার কারণ নির্ণয়ে প্যাথোলজিক্যাল কিংবা বায়োক্যামিক্যাল টেস্ট রিপোর্ট এবং সম্পাদকীয় বোধ করি প্রেসক্রিপশন।
‘আইনের তোয়াক্কা করে না পরিচালনা কমিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতি, প্রতিষ্ঠানের তহবিল আত্মসাৎ, অবৈধ নিয়োগ দিয়ে ঘুষ নেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান পরিচালনা কমিটির বিধিমালার কিছু ধারা পরিবর্তন এবং আদালতের রায়ের আলোকে কিছু ধারা সংযোজনের কাজ চলছে। বিষয়গুলো অজানা হেতু এর ভালো-মন্দ বিচারের সময় এখনো আসেনি, তবে ধারা পরিবর্তন ও সংযোজনের মাধ্যমে শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর শিক্ষকদের দুরারোগ্য ব্যাধিমুক্ত করার লক্ষ্যে কিছু বলা সমীচীন বলে মনে করছি। কারণ পরিচালনা কমিটির রূপরেখা চূড়ান্ত করা হলে তখন বলেও কোনো লাভ হবে না। যদিও পরিচালনা কমিটির ক্ষমতাধর ব্যক্তি সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে এখন মহল বেশ তোলপাড়। সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক করার চিন্তাভাবনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। গভর্নিং বডি কিংবা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্য পদে দুই বারের বেশি কোনো ব্যক্তি থাকতে পারবেন না বলে মহামান্য হাইকোর্টের পরামর্শ বাস্তবায়নের নীতিমালা তৈরির কাজও চলছে এবং মাননীয় সংসদ সদস্যগণ গভর্নিং বডির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না মর্মে একটি রায় হয়েছে (রিট পিটিশন নংম্বর ২৩০/২০১৭)। এই রায়ের আলোকে কোনো সংসদ সদস্য সভাপতি হিসেবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন আর বহাল নেই। কিন্তু সংসদ সদস্যদের স্থলে স্নাতক ডিগ্রিধারী যারা সভাপতি হিসেবে বসছেন বা বসবেন, তারা কি ধোয়া তুলসীপাতা? তারা যে ধোয়া তুলসীপাতা নন, তার জ্বলন্ত উদাহরণটিও আমরা দেখতে পাই ‘আইনের তোয়াক্কা করে না পরিচালনা কমিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। ২০১৩ সাালে মিরপুর কলেজ থেকে বরখাস্ত হন কামরুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা হয় এবং ঐ মামলায় ২০১৬ সালে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। তার পরও তাকে যোগদান করতে দেয়নি গর্ভনিং বডি। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হন তিনি। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাকে যোগদান করতে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ নির্দেশনা মানছে না গভর্নিং বডি। প্রতিবেদনে ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হলেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত ৩০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার চিত্রটিও নানা কারণে বিবর্ণ। পরিচালনা কমিটির চাপ ও তাপে শিক্ষক, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের জীবন্মৃত অবস্থা। শিখন-শেখানো নয়, তাদের লেজুড়বৃত্তি করতে করতেই সময় চলে যায়। পরিচালনা কমিটির অনিয়মে যুক্ত বা চুপ না থেকে কোনো শিক্ষক ব্যতিক্রম বাদে টিকে থাকতে পারেন না। তবে দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের অবস্থা বেশ রমরমা।
যা হোক, অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতি, প্রতিষ্ঠানের তহবিল আত্মসাৎ বা অবৈধ লেনদেনের যে জায়গাটি তৈরি হয়েছে, তা বিদ্যমান কমিটি গঠন বিধিমালা কাটাছেঁড়া করলে এতটুকুও সংকুচিত না হওয়ারই সম্ভাবনা। আজকের এই অন্তহীন সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি। ব্যবসা-বাণিজ্যের লক্ষ্যে, নাম ও প্রতিপত্তির মোহে যখন থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার হিড়িক শুরু হয়, তখন থেকেই শিক্ষার চিত্রটি দ্রুত পালটে যায়। শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন লোক মানেই জ্ঞানহীন বা অবিদ্যোত্সাহী তা ভাবার সুযোগ কোথায়? এ দেশের শতবর্ষী বা অর্ধশতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাদের অধিকাংশের কোনো সনদ ছিল না। অর্থ-বিত্তও ছিল না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান থেকে দুই পয়সা রোজগার করা যায় এমন ভাবনা তাদের কল্পনায়ও আসেনি। আর এখন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য হওয়া একটি বিনা পুঁজির ব্যবসা। সমাজে নাম-ডাক হয়, বাড়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি। তাই শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের এই জায়গা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু পরিচালনা কমিটির বিধিমালার পরিবর্তনে তা কতটা সম্ভব? যদি বলি সম্ভব নয়, তাহলে কারো কারোর গাত্রদাহ শুরু হতে পারে। তা হোক। কারণ সরিয়ে আনার চিন্তার কাঠামোটি শুধু ধারার পরিবর্তন ও সংযোজনের মধ্যে যদি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে আশানুরূপ ফললাভ হবে না। এখনো যেটুকু শিক্ষার নিঃশ্বাস আছে, তা-ও বন্ধ হয়ে যাবে। প্রসঙ্গত, যখন প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা জনে জনে চাঁদা তুলে দেওয়া হতো বা সরকার থেকে নামমাত্র পাওয়া যেত, তখন পরিচালনা কমিটির প্রয়োজন ছিল। এখন যখন বেতন-ভাতার প্রায় পুরোটাই সরকার বহন করছে, স্থাপনা তৈরি ও মেরামতে সরকারি বরাদ্দ জুটছে, তখন এ ধরনের কমিটির আর দরকার আছে বলে মনে হয় না। আবার জবাবদিহির প্রশ্নও যদি আনা হয়, তাহলে বলতে হয় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, ব্যানবেইস, এনটিআরসিএ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (স্নাতক স্তরের জন্য) কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। প্রকারান্তরে এসব কর্তৃপক্ষই শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক ও অভিভাবক। এই কর্তৃপক্ষসমূহের আদেশ, নির্দেশ ও শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তারা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও অধিভুক্তির নবায়ন হয় না। এমনকি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা স্থগিত, কর্তন ও বাতিল করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতিও ঘটে।
যদি এর পরেও পরিচালনা কমিটির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, তাহলে সেই কমিটি শিক্ষকদের দিয়েই গঠন করা যেতে পারে। তারা সভায় লেখাপড়ার মান, শিখন-শেখানো কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শিখন ও শেখানোর দুর্বলতা চিহ্নিত করে নিরাময়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর থেকে কলেজ স্তর পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ স্থাপিত হবে। বর্তমান বিদ্যমান ব্যবস্থায় এটি অনুপস্থিত। ফলে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। এই ব্যবস্থায় দুর্নীতি করার কেউ সাহস পাবে না। যদি কারো বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়, তাকে আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। এই ব্যবস্থায় কমিটি গঠন নিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জটিল অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না। কমিটিতে ঢুকতে পারা আর না পারাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কারণে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। সেই প্রশ্ন আর থাকবে না। পরিশেষে, এই অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার জায়গা থেকে শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের যেভাবে হোক দ্রুত সরিয়ে আনতে হবে। তা না হলে শিক্ষা নিয়ে প্রত্যাশার জায়গাটি ক্রমশ বিলীন হবে।
লেখক : অধ্যক্ষ, সরকারি পাতারহাট আরসি কলেজ, বরিশাল