সুপ্রিম কোর্টের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে মামলা

এখন থেকে সুপ্রিম কোর্টের বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালতকে অবশ্যই মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। যদি এর ব্যত্যয় হয় তাহলে আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক শাস্তির মুখোমুখি হবেন। হাইকোর্টের দেওয়া এই আদেশ বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সম্পদের মামলায় এমন রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এর বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন তিনি। ঐ আপিল খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ। বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের আদেশের অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাইকোর্ট চাঞ্চল্যকর অনেক হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করতে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেধে দেন। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতের বিচারককে অনেক সময় কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। তবে সুপ্রিম কোর্টের এ আদেশ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা বলেন, চাঞ্চল্যকর মামলাসমূহ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ আইনে সময়সীমা উল্লেখ থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। ফলে বিলম্বিত হয় বিচার। কিন্তু এ আদেশ বিচারপ্রার্থী জনগণের ন্যায় বিচারপ্রাপ্তিতে সহায়ক হবে।

বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। দীর্ঘ এক দশক এই মামলার কার্যক্রমের ওপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। পরে হাইকোর্ট ওই স্থগিতাদেশ তুলে নিলে মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিশেষ জজ আদালত। এই অভিযোগ গঠন চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আসেন তিনি। ২০১৭ সালে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ কোনো ধরনের মুলতবি ছাড়াই ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য বিচারিক আদালতকে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশেষ জজ আদালতের একটি আদেশ চ্যালেঞ্জ করে আবারও হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আসেন এই বিএনপি নেতা। আবেদনে বলা হয়, হাইকোর্টে বিচারাধীন সাতটি রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হোক। গত ৮ এপ্রিল হাইকোর্ট তার আবেদন খারিজ করে দেয়।

এ সংক্রান্ত আদেশের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের অনেকের মধ্যে ধারণা আছে যে হাইকোর্ট যেখানে কোনো আদেশ মানতে সময়সীমা বেধে দেন অথচ সেটা মানতে না পারলে কি হবে, তা বলে দেন না, তাই সেসব আদেশ নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয়। এই ধারণা ভুল। হাইকোর্ট বলেন, আদেশ মানতেই হবে। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বা হাইকোর্ট বিভাগ যখন নিম্ন আদালতকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময় বেধে দেবেন তখন সেটা মানা ওই আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে না পারলে অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত কারণ উল্লেখ করে সময় আবেদন করতে হবে। তবে সেই আবেদনে সুপ্রিম কোর্ট সন্তুষ্ট না হলে আদেশ লঙ্ঘনের জন্য নিম্ন আদালতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। কারণ সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালতগুলোকে হাইকোর্ট নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করবে।

এ প্রসঙ্গে দুদক কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশ নিম্ন আদালতের জন্য আইনে পরিণত হয়েছে। ফলে কোনো ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির জন্য যদি সুপ্রিম কোর্ট সময় বেধে দেয় তাহলে ওই সময়ের মধ্যেই এখন থেকে নিম্ন আদালতকে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে হবে।

প্রসঙ্গত ২০১৭ সালের ২০ মার্চ ফেনীর একরাম হত্যা মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। কিন্তু ওই বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা যায়নি। ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ আদালত ওই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। টাঙ্গাইলের আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলাটির বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই বিচার শেষ হয়নি। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, দলটির শীর্ষ নেতা মির্জা আব্বাস, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির কয়েকটি মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বিশেষ জজ আদালতের প্রতি নির্দেশনা রয়েছে উচ্চ আদালতের।