ইউএস ক্যাপিটল রক্ষাকারী অফিসারদের সঙ্গে যখন ৬ জানুয়ারি আমার একান্ত আলাপ হয়, তখন কথোপকথনে প্রায়ই ঘুরেফিরে আসে একটি প্রশ্ন—বিদ্রোহ সম্পর্কে মার্কিনিরা এখনো ঘুমিয়ে কেন? স্বভাবতই বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা নিয়ে আমেরিকার জনগণ বেশ খানিকটা উদাসীন! এমনকি বেশির ভাগ মার্কিনি এ বিষয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন নয় বলেই মনে হয়। এটা যে গণতন্ত্রকে শেষ করার অপচেষ্টা—এ কথা কেন তারা বুঝতে পারছেন না, সেটাই গভীর চিন্তার বিষয়।
আমার মতো সকল পুলিশ অফিসারের এই টপিক নিয়ে আলোচনা করা উচিত নয় যদিও, কিন্তু একান্ত আলাপচারিতায় প্রসঙ্গক্রমে আমেরিকার সাম্প্রতিক বিদ্রোহ-ফ্যাসাদের বিষয়টি চলে আসে। যেমন—সম্প্রতি একজন অফিসার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “মাইক (আমি), আমরা যদি সেদিন অপ্রতিরোধ্য শক্তির বিরুদ্ধে এত ভালোভাবে রুখে না দাঁড়াতাম, উত্তেজিত লোকজনকে থামাতে না পারতাম, দুর্বার প্রতিরোধ গড়তে না পারতাম, তাহলে হয়তো মার্কিন জনগণ ‘বিদ্রোহ’ কী জিনিস তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারত। এ বিষয়ে তাদের টনক নড়ত। অর্থাৎ জনগণ ‘বিদ্রোহ ইস্যু’কে গভীরভাবে আমলে নিত।”
কোনো কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর আহত হলে, ভবনের ভেতর থেকে কোনো রাজনীতিককে টেনে-হিঁচড়ে ফাঁসির মঞ্চে লটকানোর জন্য নিয়ে গেলে বা কাউকে গুলি করে বা পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা ঘটলেই কেবল জনগণ বিদ্রোহকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে—এমন দাবিকে অস্বীকার করার সুযোগ কম। কেবল তখনই হয়তো জনগণ আসল ঘটনা বুঝতে পারবে এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যেক সুসংহত রাখতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বুঝেশুনে ভোট দেবে। হয়তো তখন তারা বুঝতে পারবে—আমরা যদি ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’কে রক্ষা করতে না পারি, তবে আমরা অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়েও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারাব।
ইউএস হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির স্বামী পল পেলোসির ওপর কিছুদিন আগেকার নৃশংস হামলার আগ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক প্রার্থী ৬ জানুয়ারি সম্পর্কে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বিশেষ করে সুইং ভোটাররা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং গর্ভপাতের বিষয় নিয়েই পড়ে আছেন। কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষণীয়, অপরাধের বিষয়েও ভোটারদের বড় একটা অংশ তথা জনগণের বেশ আগ্রহ রয়েছে।
পল পেলোসির ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ আসন্ন নির্বাচনে একটি বিশেষ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হবে বলেই আমার বিশ্বাস। এ বিশ্বাস বাস্তবে রূপান্তরিত না হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না; কিন্তু অন্য আরেকটা বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। আমি ভয় পাচ্ছি এ কারণে যে, ‘রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত সহিংসতা’ দিনদিন বেড়েই চলেছে। এ প্রবণতা থামাতে যদিও ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু তার পরও এ বিষয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নিয়ে আর তেমন কোনো আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে না। এমনকি আমাদের নেতাদের মুখ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে সর্বজনীন নিন্দাও আর খুব একটা শোনা যাচ্ছে না।
ভুলে গেলে চলবে না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় শক্তিধর নেতা ন্যান্সি পেলোসির ৮২ বছর বয়সি স্বামীকে কেবল রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করেই নিজ বাড়িতে মারধর করা হয়। পলকে মারধরের পর দুষ্কৃতকারী পেলোসির বাড়িতে অবস্থানের মতো দুঃসাহস করেছেন। এমনকি তিনি পেলোসির বাড়িতে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন বলেও গোঁ ধরে বসেছিলেন। ভাবা যায় এগুলো! এত বড় সহিংস ঘটনা সত্ত্বেও হাতেগোনা কতিপয় ডানপন্থি মিডিয়া এবং কিছু রিপাবলিকান নেতা অল্পবিস্তর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মাত্র!
কিছু লোককে আগে বলতে শোনা যেত—‘এগুলো খেলা বা মজা করার মতো—যতক্ষণ না কাউকে আঘাত বা আহত করা হচ্ছে।’ কী সাংঘাতিক! তাদের কথা কিছু সময়ের জন্য ঠিক বলেও ধরা নেওয়া হলেও, এর বাস্তব চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে এখন। এখন আঘাত করা হচ্ছে, মানুষকে আহত করা হচ্ছে। সুতরাং এখন সেসব লোক কী জবাব দেবেন?
দুঃখজনক বিষয় হলো, সাবেক প্রেসিডেন্টের পুত্রসহ কিছু রিপাবলিকান নেতা এখনো মনে করেন—এগুলো মজা এবং খেলা; সুতরাং একে ক্ষমার চোখেই দেখা উচিত। কী অদ্ভুত কথা! এরকমটা করলে দুষ্কৃতকারীদের জন্য তা উত্সাহজনক হবে এবং এর ফলে সহিংসতা আরো বেড়ে যাবে—এটা তো পানির মতো পরিষ্কার!
এ ধরনের উসকানিমূলক কথাবার্তা কোথা থেকে এবং কেন আসছে, সে সম্পর্কে আমার বেশ ভালো ধারণা আছে। উসকানিদাতারা ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন—সহিংসতা এবং হুমকি কাজ করছে বেশ ভালোমতোই। স্থানীয় নির্বাচন কর্মীরা, বিশেষ করে নিঃস্বার্থ-নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা প্রবীণ জনগণ, দলে দলে ভোট কেন্দ্র পরিত্যাগ করছেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মানুষকে এক প্রকার আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে একটি গোষ্ঠী।
মাথায় না রাখলে চলবে না, ক্যাপিটলের ঘটনার পর রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছিল—৬ জানুয়ারি দাঙ্গাকারীরা ‘বৈধ রাজনৈতিক বক্তৃতায়’ হিলে জড়ো হয়। অর্থাৎ তাদের অপরাধকে খুব একটা বড় করে দেখা হয়নি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘোষণাকে আমরা তথা পুলিশ বাহিনী ‘একটি সূত্র’ বলে অভিহিত করে থাকি। তাদের এজেন্ডায় পরবর্তী সময়ের জন্য কী রয়েছে তার একটি ধারণা পাওয়া যাবে এই সূত্র থেকে। সূত্র অনুযায়ী, রিপাবলিকানরা এখন আর শুধু হুমকি প্রদান কিংবা কিছু নির্বাচিত কর্মকর্তা ও নির্বাচনি কর্মীদের টার্গেট করছে না। বরং এমন সব কাজকর্ম করছে, যাতে করে দেখা যাচ্ছে, তারা নিজেরাই যেন ভোটারদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে!
সুতরাং, কোনো ভুল করা যাবে না। ভোটের অধিকারই মূলত ব্যালটের অধিকার, কিন্তু রিপাবলিকানরা এই সত্যকে মানতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস—ভোটাধিকার সুরক্ষার মানে হলো, বিরোধীদের ভোট থেকে ব্যালটকে রক্ষা করা। অর্থাৎ, রিপাবলিকানদের দমিয়া রাখার চেষ্টা করা হতে পারে বলে তারা মনে করে। এটা যে তাদের ভ্রান্ত ধারণা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত এ ধারণা থেকেই রিপাবলিকানরা ভোট দেওয়াকে এতটা কঠিন করে তুলছে। তারা ভোটদানকে সীমিত করার মতো নিয়ম তৈরি করছে। এমনকি অ্যারিজোনায় ব্যালট বাক্সে সশস্ত্র, মুখোশধারী গার্ড মোতায়েনের মতো কর্মকাণ্ডের অবতারণা করছে। এসব জনগণকে ভয় দেখানো ছাড়া আর কিছুই না। অর্থাৎ, বিভ্রান্ত হওয়া চলবে না কোনোভাবেই।
আমার বক্তব্য হলো, জনগণ পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে, যদি তাদের সেভাবে সাহায্য করা যায়। কাজেই তাদের সাহায্য করার জন্য যা যা দরকার, আমাদের তা করতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে ভেবেচিন্তে ভোট দেওয়া কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করে জনগণকে বোঝাতে হবে। এটা সহজ কাজ নয়, তা জানি। কিন্তু এ কাজের মাধ্যমেই সফলতা পাওয়া সহজতর হবে। আমি একটা বিষয়ে খুবই জোর দিয়ে বলতে পারি, মার্কিন জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করাকে তারা (রিপাবলিকান) যতটা সহজ বলে মনে করছে, তার থেকে বেশি সহজ তাদের বোকা বানানো। আমি বিশ্বাস করি না যে, আমেরিকায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ট্রাম্পের। আমি এ-ও বিশ্বাস করি না যে, জনগণকে বিভ্রান্ত করতে ট্রাম্প ও তার অনুসারীরা সফল হবে। বরং আমার বিশ্বাস, যে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ নিয়ে তিনি বড়াই করছেন, তার দায় মার্কিন জনগণেরই—আমাদের ‘উদাসীনতা’র সুযোগ নিয়েই তিনি আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা করছেন।
ট্রাম্প এবং তার ভাড়াটে গুণ্ডাদের ভয় পাওয়ার অনেক কারণ রয়েছে বৈকি। কিন্তু এর থেকে বড় বিষয় হলো, গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে উদাসীনতা, যা জাতি হিসেবে আমাদের পতন ডেকে আনতে সময় নেবে না। দেশে কী ঘটছে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট যত্নশীল বলে মনে হচ্ছে না। এটা সত্য যে, বর্তমান বাস্তবতায় মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপরন্তু এরকম আরো লাখ লাখ বিক্ষিপ্ত কারণ রয়েছে। ইলন মাস্ক টুইটার কিনেছেন। টম এবং জিজেলের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে। কারদাশিয়ান তার শিশুর নতুন নতুন ছবি শেয়ার করছেন! এসবের মধ্যেও মার্কিনিদের এই প্রশ্নের উত্তর মেলানোর চেষ্টা করতে হবে—এই নির্বাচনকে কেন ভিন্ন চোখে দেখা দরকার?
বাস্তবিক অর্থেই, ৬ জানুয়ারির পর ‘ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করার’ প্রশ্নে এটাই আমাদের প্রথম সুযোগ এবং একই সঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নেও এটাই হয়তো শেষ সুযোগ। অতএব, মার্কিন জনগণকে ভেবেচিন্তে পা বাড়াতে হবে। ভোট দেওয়ার আগে অনেক কিছুকে মাথায় ঢোকাতে হবে। এবং সর্বোপরি, আমাদের ‘উদাসীন বন্ধু’দের নির্বাচনে টেনে আনতে হবে। অনেক দেরি হওয়ার আগেই যা করার করতে হবে। তা না হলে, এর ফল কী হতে পারে তা সময়মতো সবাই নিজ চোখেই দেখতে পাবে।
লেখক :৬ জানুয়ারি ইউএস ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় আহত ওয়াশিংটন ডিসির সাবেক পুলিশ অফিসার, ‘হোল্ড দ্য লাইন :দ্য ইনসারেকশন অ্যান্ড ওয়ান কপস ব্যাটল ফর আমেরিকাস সোল’ স্মৃতিকথার লেখক ও সিএনএনের ‘ল এনফোরসমেন্ট অ্যানালিস্ট’
সিএনএন থেকে ভাষান্তর : সুমৃৎ খান সুজন