‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন সম্পন্ন করলো আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে উপমহাদেশে প্রথম কোনো রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন এটি। শুক্রবার (৪ নভেম্বর) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।
শনিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় এই সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠান হয় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। কনফারেন্সের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয় ‘স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে যাত্রা এবং ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন’।
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। ২০টি ক্যাটাগরিতে ইতোমধ্যে ৫৭৮ জন গবেষক তাদের গবেষণা পত্র জমা দিয়েছে। পেপার ও পোস্টার মোট জমা পড়েছে ৬৬২টি। শুধু বাংলাদেশের গবেষকরা নন— ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, ভারত, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর থেকেও গবেষকরা শতাধিক পেপার জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন— সিলিকন ভ্যালির বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ, অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার ম্যাকমাস্টার ও ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকার টেক্সাস আর্লিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের কিউসু বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, চায়না অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা। এ ছাড়াও বুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, রুয়েট, ডুয়েট, আইইউটি এবং দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন- আইডব্লিউএম, সিইজিআইএস, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদিতে কাজ করছেন এমন গবেষকরা সম্মেলনে পেপার জমা দেন।
সমাপনী দিনে সকাল ১০টা থেকে টেকনিক্যাল সেশন শুরু হয়। এদিন আইইবি’র কাউন্সিল রুমে সম্মেলনের তৃতীয় এবং সমাপনী দিনের প্রথম মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র উপাচার্য অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদার। এর পর ১০টি আলাদা ভেন্যুতে ৭০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে চতুর্থ এবং শেষ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইইই'র ইতিহাসের প্রথম বাঙালি প্রেসিডেন্ট ড. সাইফুর রহমান। এরপর আলাদা ১০টি ভেন্যুতে ৭৩টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন গবেষকরা। এর আগে শুক্রবার সকালে আইইবি’র অডিটোরিয়ামে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে প্রায় ২৫২টি গবেষণাপত্র উপস্থাপিত হয়। এসব গবেষণাপত্র থেকে যে সব সুপারিশ আসবে সেগুলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দফতর সেল এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে দলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার। সমাপনী অনুষ্ঠানে উপ-কমিটির চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. হোসেন মনসুরের সভাপতিত্ব স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর। এছাড়া অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার মুনাজ আহমেদ নূর এবং সদস্য সচিব প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন, উপকমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহাদাৎ হোসেন (শীবলু)।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মতিয়া চৌধুরী বলেন, এখন আর গ্রামে হালচাষ হয় না। যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে সর্বত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন বাংলার ছাত্রী, কিন্তু উনি আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। তাঁর পেছনে এমন একজন কারিগর আছেন, যে আমাদের পথ মসৃণ করেছেন। নামের সাথেই জয় করছেন সব। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ যদি না করা হতো, তবে করোনায় থমকে যেতো জীবন যাত্রা। মানুষ খাবার অর্ডার করে এখন অনলাইনে। মন্বন্তর ও মারিয়ে বাংলাদেশকে থামানো যায় না, যাবেও না। বাংলাদেশ যেখান থেকে উঠে আসছে তা কেউই ভাবতে পারেনি। যে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করেছিল সেই কিসিঞ্জারই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পুরস্কৃত করেছেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যতই বলা হোক তার পেছনে রয়েছে মানুষ। মানুষ যা চেয়েছে, মানুষ তাই পেরেছে।
সমাপনীতে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফা জব্বার বলেন, আমরা চারপাশে তাকালেই দেখি সব কর্মে সূচনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ বপন করেন বঙ্গবন্ধু। বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, টিঅ্যান্ডটি বোর্ড গঠন, আইটিইউর সদস্য পদ অর্জন, বিশ্ব ডাক সংস্থা (ইউপিইউ)'র সদস্য পদ অর্জন, এখন যাঁরা লাফালাফি করেন তারা এক সময় ভাবতো সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হলে দেশের তথ্য বাইরে পাচার হয়ে যাবে। আসলে বিএনপি কোন নতুন জিনিস গ্রহণ করতে ভয় পায়। মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তারুণ্য। এই তরুণদের যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবেও নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ।
এদিকে সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, যারা ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করতো, যারা আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বন্ধুগণ, আমাদের ডিজিটাল রূপকল্প নিয়ে কথা বলতেন- যে দেশের ৪০ শতাংশ ঘরে বিদ্যুৎ নেই, সে দেশ কীভাবে ডিজিটাল হবে? শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন যে, যদি সততা থাকে, দূরদর্শিতা থাকে, সাহসিকতা থাকে তাহলে অবশ্যই একটা দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নত মধ্যম আয়ের প্রযুক্তি নির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশে উন্নত করা যায়।