নওশাদ হোসেনের বয়স ৯ কিংবা ১০। কাজ করেন তিন চাকার গাড়ির হেল্পার হিসেবে। ১০-১২ জন ধারণসম্পন্ন গাড়িটিতে যাত্রী ওঠানো ও ভাড়া কালেকশন করার দায়িত্ব তার। কচি একটা শিশু। যাত্রাপথে তার সঙ্গে কথা হয়। দিনমজুর বাবার ছেলে নওশাদ স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। পেটের দায়ে বেছে নিয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাটি। অদক্ষ বয়সে কী দক্ষতার সঙ্গে সে কাজ করছে। এক হাতে চলন্ত গাড়ি ধরে অপর হাতে ভাড়া কাটছে। জানতে চাইলাম, বেতন কত পাও; হেসে উত্তর দিল—৫০ কিংবা ৬০ টাকা। ড্রাইভার দুবেলা খাবার খাওয়ায়। তার মধ্যে কাজে ত্রুটি থাকলে মাইর কিংবা গালিগালাজ অথবা কাজ থেকে ছাঁটাই। বললাম, স্কুলে যেতে, পড়ালেখা করতে ইচ্ছে করে কি না। এক বাক্যে উত্তর দিল, বাবা স্কুলে যেতে দেবেন না, কাজ করে খেতে হবে।
এরকম হাজারো নওশাদ আছে বিভিন্ন স্থানে শ্রম বিক্রি করে। তাদের কেউ গাড়িতে, হোটেলে, গ্যারেজে, দোকানে, কৃষি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিংবা উত্পাদনমুখী কারখানায়। নামমাত্র বেতন কিংবা শুধু ভাতে-পেঠে কাজ করে অনেক শিশু। যে বয়সে মা-বাবার আশ্রয়ে বড় হওয়ার কথা, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলার সময়, সেই বয়সে হাজারো মায়ের সন্তান দুবেলা খাবারের সন্ধানে বের হয়ে নিজের ও পরিবারের হাল ধরার চেষ্টা করে। শিশুশ্রম বাংলাদেশের গুরুত্বের বিষয়গুলোর মধ্যে একটি। দারিদ্র্য, সামাজিক ও পারিবারিক অবহেলাসহ নানাবিধ প্রসঙ্গে শিশুশ্রমের উৎপত্তি হয়।
ইউনিসেফের তথ্যমতে, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোতে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে এক জনের এবং কিছু বেশি শিশুশ্রমে নিয়োজিত হয়। আর বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে এক জন শিশুশ্রমের শিকার হয়। শিশুশ্রম ও ঝরে পড়া কমাতে বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। শিক্ষার পরিবেশকে আনন্দমুখর করেছে। শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনেই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠন, শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। তবু শিশুশ্রম রোধ করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ জাতীয় শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের দিয়ে কাজ করানো হলে তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে। যদি কোনো ব্যক্তি শিশু নাকি কিশোর—এই সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তাহলে ঐ ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন সনদ, স্কুল সার্টিফিকেট বা রেজিস্টার্ড চিকিৎসক কর্তৃক পদত্ত বয়সসংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রে তা নিষ্পত্তি হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ভাষ্যমতে, শিশুদের দ্বারা করা সব কাজকে শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য করা যাবে না। স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত বিকাশকে প্রভাবিত করে না, পড়ালেখায় হস্তক্ষেপ করে না, পারিবারিক ব্যবসায় সহায়তা, স্কুলের বাইরের সময় নিজেকে বিকশিত করে এমন কর্মকাণ্ডকে সরাসরি শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য করা যাবে না। শিশুর মানসিক, শারীরিক, সামাজিক, বিপজ্জনক কাজ, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে কিংবা স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য করে অথবা তাদের সম্ভাবনা, মর্যাদা ও সুরক্ষা থেকে দূরে রাখে এমন সবকিছু শিশুশ্রমের আওতাভুক্ত। শিশুর বয়স, কাজের ধরন, সময় ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে শিশুশ্রম।
ইউনিসেফ ও আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ১৬ কোটিতে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারিতে আরো লাখ লাখ শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লিখিয়েছে। স্থায়ী উন্নয়নসহ শিশু ঝরে পড়া কমিয়েছে অনেকাংশে। কোভিড মহামারির ব্যাপক হারে প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনসহ দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে অনেক পরিবার তাদের শিশুসন্তানদের কাজে পাঠিয়েছে। অল্প মজুরিতে বেশি কাজ আদায়ের লক্ষ্যে অনেক মালিকপক্ষ শিশু শ্রমিকদের সর্বোত্তম হিসেবে মনে করে। অনেক সময় শিশু শ্রমিকদের দিয়ে মাদক আদান-প্রদান, বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে। সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের যে আধিপত্য, তারও পেছনে শিশুশ্রম অনেকটাই দায়ী।
অল্প বয়সে তাদের টাকা হাতে আসার কারণে পারিবারিক, সামাজিক যথাযথ অভিভাবক না থাকার কারণে শিশু বয়স থেকে মাদকাসক্তসহ নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে। অনেকে কথিত বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় বড় হয়ে একদিন বড় মাপের অপরাধী হয়। শিশুদের যথাযথ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং সুন্দর, বাসযোগ্য, সুস্থ, মানসিক ও দৈহিক বিকাশে পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা, বিনোদন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সোনার বাংলাদেশ গড়তে শিশুশ্রম রোধ করা জরুরি। সামাজিক, রাজনৈতিক, বিশেষভাবে পারিবারিক সচেতনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ শিশুশ্রমে উত্সাহ, শিশু কর্মী নিয়োগদাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম আইন কলেজ