উষ্ণতার ছোঁয়ায় ফোটাই হাসি

দিগ্বিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতল সমীরণের দোলায় ঋতুবৈচিত্র্যের অপরূপ তথা ঐশীমণ্ডিত শীতকালের আগমনিবার্তায় মাতোয়ারা বাঙালি প্রাণ। তথাপি, আর্থসামাজিক এবং মানবিক দিক থেকে অন্যসব ঋতুর থেকে জনজীবনে শীতকালের প্রভাবও যেন বেশি করে ধরা দেয়! শীত যেমন তার আগমনি লগ্নে হরেক রকম আনন্দ-খুশির উপলক্ষ্য নিয়ে হাজির হয়; পাশাপাশি দুঃখের দুর্বিষহ অভিশাপ হয়ে তা আবার প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে শীতার্তদের জন্য। শীতের আমেজে যখন কেউ কেউ বানায় শীতের পিঠা, ঘোরাঘুরি করে, বাহারি রঙের পোশাক পরে বিভিন্ন উৎসব আয়োজন করে; বিপরীতে শীতার্ত মানুষ তথা শীতপ্রবণ অঞ্চলের (বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল, হাওয়রাঞ্চল এবং শহরের ছিন্নমূল মানুষজন) বাসিন্দারা নিষ্ঠুর কষ্টে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হয়। দুমুঠো অন্ন জোগাড়ে ব্যতিব্যস্ত মানুষজন জীবন বাঁচাতে প্রকৃতির এই চিরায়ত নির্মম নিয়মের কশাঘাতে খাবি খায়। এই চিত্র প্রতিটি শীত মৌসুমেই দেখা যায়।

জীবনরক্ষা যেখানে দুর্বিষহ, অন্ন খোঁজে হন্যে হয়ে থাকা বিলাসিতা বই কিছুই নয়! তবে প্রকৃতির এই বিরূপকে সহনীয় করে তুলতে ভূপেন হাজারিকার শতাব্দীর সেরা ‘মানুষ মানুষের জন্যে’ গানে সাড়া দিয়েই সরকারি তহবিল, সেচ্ছাসেবী সংগঠন, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ছুটে আসেন মানবিক সহায়তায়। বাড়িয়ে দেন তাদের উষ্ণতার ছোঁয়া, হাসি ফোটে শীতার্তদের মধ্যে। তবে সুষম বণ্টনের অভাবে শীতে কাঁপতে থাকা মানুষের সমস্যার আশু সুরাহা মেলে কি না, তা বোঝা মুশকিল। কারণ এই মানবিক সহায়তার মধ্যেও কথিত কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ তাদের মুনাফা খোঁজে! এতে সরকারের পক্ষ থেকে আসা বরাদ্দের সঠিক বণ্টন হওয়া নিয়ে রয়ে যায় নানা প্রশ্ন। এমতাবস্থায়, সরকারের উচিত হবে বস্ত্রের সুষম বণ্টনে সঠিক দৃষ্টি দেওয়া।শুধু কি বস্ত্রদানে তাদের মুখে হাসি ফুটবে? শীত তার আগ্রাসি রূপ ধারণ করে শৈত্যপ্রবাহের ক্ষণে। ফলে দিনমজুরের যাপিত জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক মুহূর্ত কাটে অনিশ্চিত সম্ভাবনাময়। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবে অসচেতনতার দরুন অকালে ঝরে যায় তাজা প্রাণ। এহেন অবস্থায় সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রভাবসম্পন্ন মানুষের এগিয়ে আসা একান্ত জরুরি। হাড় কাঁপানো শীতের কবল থেকে তাদের উদ্ধার করা এবং সামর্থ্যের ভিত্তিতে সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা প্রত্যেক মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। এটি একধরনের ইবাদতও বটে। হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজখবর নাও, বস্ত্রহীন লোকদের বস্ত্র দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করে দাও’ (বোখারি :২৪১৭)। মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বলা হয়। সেই মানুষেরই একটা অংশ গরিব-দুস্থ। তারা যে আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ তা যেন আমরা ভুলে না যাই। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌল অধিকার তাদেরও ন্যায্যপ্রাপ্য। তাই গরিব-অসহায়-দুস্থের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রদর্শন ও সহানুভূতিশীল হওয়া অতীব জরুরি। মানবিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে শীতে ফুটপাতে বা খোলা আকাশের নিচে বসবাসকারী অসহায় ছিন্নমূল মানুষের পাশে সামর্থ্যের ভিত্তিতে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার বিষয়ে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।

ইতিমধ্যে সারা দেশে শীত জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলোতে এর প্রকোপ বাড়বে প্রতিবারের মতোই—এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং এখন থেকেই একটু উষ্ণতার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করেছে শীতার্ত সুবিধাবঞ্চিতরা। সুতরাং, তাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়কে আমলে নিতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, এটি সবার মানবিক দায়িত্ব। তাই আসুন, অসহায়-সুবিধাবঞ্চিত শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ হই। তাদের প্রতি উষ্ণতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে আন্তরিক হই। আমরা যেন কোনোভাবেই এই বিষয়টা ভুলে না যাই।
লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়