ইউক্রেনে পুতিনের জয় যে বিপদ ডেকে আনবে

রাশিয়াকে ক্রিমিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী কার্চ ব্রিজে গত মাসে বিস্ফোরণের পর বেপরোয়া পুতিন বাহিনী ইউক্রেনে হামলা তীব্র করেছে। ২০১৪ সালে নির্মিত এই সেতু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অতি আবেগের স্থাপনা। এই হামলা পুতিনের জন্য তাই অত্যন্ত অবমাননাকর। অর্থাৎ, কার্চ ব্রিজের ঘটনার উত্তাপ যে ইউক্রেনে আছড়ে পড়বে, তা সবার জানাই ছিল। বাস্তবে ঘটেও তাই। এ ঘটনার পর ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে উপর্যুপরি আক্রমণ শুরু করে ক্রেমলিন। অ্যাপার্টমেন্ট ভবন, পাওয়ার গ্রিডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মুহুর্মুহু বোমা নিক্ষেপ করে রাশিয়ান বাহিনী। এমনকি রাজধানী কিয়েভে সরকারি স্থাপনার অতি নিকটবর্তী এলাকাও রকেট লঞ্চার ছুড়ে গুঁড়িয়ে দেয় রুশ সেনারা।

বর্তমান সময়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইউক্রেনে হামলা চালাতে রাশিয়ান বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের বেশির ভাগ আসছে ইরান থেকে। রাশিয়াকে শত শত মারাত্মক প্রাণঘাতী ড্রোন সরবরাহ করেছে দেশটি। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করতে রাশিয়াকে আরো বিপুল পরিমাণে অস্ত্রসহায়তা করতে চায় ইরান। রাশিয়ান সেনাদের শক্তিশালী সব অস্ত্র দিচ্ছে দেশটি। 

মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার এই নিবিড় সম্পর্ক অনেকের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু দেশগুলো, ন্যাটো সদস্যসহ বেশ কিছু দেশ ইরানের সঙ্গে করা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিকে ঢেলে সাজানোর কথা বলছে। এই অবস্থায় ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, বিশ্বের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে ইউক্রেন। 

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আট মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। থামানো যায়নি যুদ্ধ। বরং ইউক্রেন ক্রমাগতভাবে এমন এক মঞ্চে পরিণত হয়ে উঠেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে, বহুমুখী যুদ্ধ চলছে ইউক্রেনের মাটিতে। এবং এই যুদ্ধের প্রভাবে পুরো বিশ্বেই যেন বিরাজ করছে ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা! আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, এই যুদ্ধের কারণে কতটা বেকায়দায় পড়তে হয় বিশ্বকে। 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে উদ্দেশ্যে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালান পুতিন, তা সফল হয়নি। ইউক্রেনে তাণ্ডব চালানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট পুতিন কোনো কার্পণ্য করেননি যদিও, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কাছে সাফল্য অধরাই রয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, ইউক্রেন ঘিরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার উপক্রম হলে পুতিন তা ক্রমাগত অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন। অথচ গোপনে-সন্তর্পণে যুদ্ধের দিকেই যাত্রা করছিলেন তিনি। নিজের স্বৈরাচারী শাসনকে পাকাপোক্ত করতে প্রতিবেশী দেশের গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করাই ছিল পুতিনের লক্ষ্য। 

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের উচিত হবে মানব ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ও পথপরিক্রমার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। এর সূত্র ধরে বিচার করলে আমরা দেখতে পাই, ইউক্রেনে যদি রাশিয়া বিজয় পায়, তবে তা এমন এক আগ্র্রাসনমূলক যুদ্ধের দরজা খুলে দেবে, যার ফলে এক দেশ অন্য দেশকে আক্রমণ করে কবজা করার চিন্তা করার সাহস পাবে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ অধ্যায়ের সূচনা করবে।’

ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে এই অঞ্চলে। সম্প্রতি সৌদি আরবের নেতৃত্বে তেল উত্পাদনকারী দেশগুলো যখন উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলে, রাশিয়াকে তেলের আয় বাড়ানোর সুবিধা করে দিতেই এই কাজ করেছে সৌদি ও তার মিত্ররা। অর্থাৎ, সৌদির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থায়ন-সহায়তার অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অভিযোগ সৌদি অস্বীকার করেছে যদিও, কিন্তু বিতর্কের যবনিকাপাত ঘটানো যায়নি।

ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করা ও না করার প্রশ্নে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইসরাইল। ইসরাইলের কাছে আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিংসহ বেশ কিছু ‘সিস্টেম’ সরবরাহের আবেদন জানিয়ে আসছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। কিন্তু ইসরাইল নিজস্ব কৌশলগত উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গ্যান্টজ সম্প্রতি পূর্বের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ইউক্রেন, ন্যাটো ও পশ্চিমকে সমর্থন করে ইসরাইল। এমনকি যেসব দেশ ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতিও সমর্থন-সহানুভূতি রয়েছে আমাদের। কিন্তু কোনো সিস্টেম ইউক্রেনে সরবরাহ করব না আমরা।’

যা হোক, চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। দেশে দেশে বেড়েছে খাদ্য ও জ্বালানির সংকট। ব্যাপকভাবে বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ রয়েছে সীমাহীন ভোগান্তিতে। কোনো সন্দেহ নেই, ইউক্রেনে যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এমনকি বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার জন্যও এই যুদ্ধ সমভাবে দায়ী।

ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে রাশিয়ান বাহিনীর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর ইউক্রেন থেকে বিশ্বে খাদ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ান বাহিনীর টহল শুরু হওয়ার কারণে ইউক্রেনের শস্য কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যায়নি। এর ফলে বিশ্বে আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে খাদ্যের দাম। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগামের (ডব্লিউএফপি) প্রধান ডেভিড বিসলে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্ব অনাহার-দুর্ভিক্ষের দিকে হাঁটছে।’ সত্যিকার অর্থেই বিসলের কথা যেন বাস্তব হয়ে উঠছে!

জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার ফলে ইউক্রেনের বন্দর ও সামুদ্রিক করিডরগুলো নতুন করে চালু করা সম্ভব হয়েছিল যদিও, কিন্তু তা বন্ধ হয়ে গেছে আবারও। সেভাস্তোপল বন্দরে রাশিয়ান জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটলে পুতিন অনির্দিষ্টকালের জন্য শস্য রপ্তানি বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ, তিনি চুক্তি থেকে সরে এসেছেন। পুতিনের চুক্তি বাতিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে গমের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করে।  

মূলত ইউক্রেন যুদ্ধ সর্বত্র এবং সবাইকেই ভোগাচ্ছে। এই সংঘাত জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি-মুদ্রাস্ফীতির রীতিমতো বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইউক্রেনে যুদ্ধ। মাথায় রাখতে হবে, উচ্চমূল্য শুধু পারিবারিক বাজেট ও ব্যক্তিগত জীবনকেই বেকায়দায় ফেলে না; বরং তা এমন এক শক্তিশালী ঝড় সঙ্গে করে নিয়ে আসে, যার জোর ধাক্কা লাগে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। বিভিন্ন দেশ উচ্চমুদ্রাস্ফীতির কারণে আজ ভয়াবহ অবস্থায় নিপতিত। গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন বেশ কিছু দেশের ক্ষমতাসীন নেতারা। সবাই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা ভাবছেন বটে; কিন্তু সংকট উত্তরণে পাচ্ছেন না কোনো কিনারা। 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুতিনের বেশ কিছু ভক্ত এখন তার বিরুদ্ধে কথা বলছের। পশ্চিমে তার অনেক বন্ধু ছিল, যা সবারই জানা। কিন্তু এখন পুতিন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তারা। আবার অনেকেই তার পক্ষে সরব হচ্ছে নতুন করে—এ দাবিও ফেলে দেওয়া যায় না। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিবিদ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি পুতিনের পক্ষকে সমর্থন করছেন। এসব রাজনীতিবিদের পুতিনের পক্ষে কথা বলার সুরির্ধারিত কারণ রয়েছে বৈকি। কারণ, আসন্ন শীতে দেশে দেশে জ্বালানিসংকটের কারণে যে চরম অসন্তোষ দেখা দেবে, তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে পুতিনের পক্ষে কথা না বলে উপায় নেই। এমন চিন্তা করা লোক হাতে গোনা যদিও, কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে জয়ী পুতিনই। তার কৌশল এক্ষেত্রে কাজে আসছে বলা যায়। 

যা হোক, পুতিনের বিরুদ্ধেই আওয়াজ বেশি। যেমন—রিপাবলিকান নেতা কেভিন ম্যাককার্থি, যিনি আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হাউজ স্পিকার নির্বাচিত হতে পারেন, পরামর্শ দিয়েছেন, ‘ইউক্রেনে সহায়তা কমানোর জন্য মার্কিন জনগণ রিপাবলিকানদের বেছে নিতে পারে।’ জ্বালানিসংকটের কারণে ইউরোপ টালমাটাল হয়ে উঠলে পুতিনের পক্ষে না হাঁটার পরিবর্তে অধিকাংশ দেশ বিকল্প ব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিতেই মনোনিবেশ করছে। তবে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। 

ভুলে গেলে চলবে না, ইউক্রেন যুদ্ধ দিনে দিনে বৈশ্বিক সংঘাতের এমন এক কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে, যার ধাক্কায় এখন সমগ্র বিশ্বই পেন্ডুলামের মতো দুলছে। প্রতিটি দেশ, প্রতিটি জীবনে এই যুদ্ধের দামামা কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলছেই। রাশিয়ার আগ্রাসন, ইরানি ড্রোন, বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু, ক্ষুধার অস্ত্রায়ণ—কী ঘটেনি এই যুদ্ধে! ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন দেশ। জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হয়েছে। বেড়েছে জাতীয়-আন্তর্জাতিক উত্তেজনা। ঠিক এমন একটি অবস্থার জন্ম যে যুদ্ধের হাত ধরে, তার অবতারণাকারীকে কি কোনোভাবেই জয়ী হতে দেওয়া ঠিক হবে? এই যুদ্ধ যতই সামনের দিকে গড়াবে, বিশ্বের স্বাধীনতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি ততই বিঘ্নিত ও সীমিত হতে থাকবে। সুতরাং, ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে, কোন পথে হাঁটব আমরা—পুতিনকে সমর্থন করে অস্থিতিশীলতার জাঁতাকলে পিষ্ট হব, নাকি যেকোনোভাবেই হোক তাকে পরাজিত করে বৈশ্বিক শান্তির নতুন যুগের সূচনা করব? 

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
সিএনএন থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন